একের পর এক বাস্তব চরিত্রকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তুলে প্রশংসা কুড়িয়েছেন মনোজ বাজপেয়ী। এবার ‘গভর্নর: দ্য সাইলেন্ট সেভিয়ার’–এ তিনি হয়েছেন ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের (আরবিআই) সাবেক গভর্নর এস ভেঙ্কিটারমনন। ১৯৯১ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছবিটি বক্স অফিসে বড় সাফল্য না পেলেও চিত্রনাট্য ও অভিনয়ের জন্য প্রশংসিত হয়েছে। চরিত্রের প্রস্তুতি, ইতিহাসভিত্তিক চলচ্চিত্র, বক্স অফিস ও পুরস্কার নিয়ে ভারতের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা মনোজ বাজপেয়ীর সঙ্গে কথা বলেছেন প্রথম আলোর মুম্বাই প্রতিনিধি দেবারতি ভট্টাচার্য।
মুম্বাইয়ের আজাদনগরে প্রযোজক বিপুল শাহর প্রযোজনা সংস্থা সানসাইন পিকচার্সের অফিসে বসেছিল এই আড্ডা। ভেঙ্কিটারমননের মতো বাস্তব চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তুতিটা গবেষণা দিয়ে শুরু হয়েছিল। মনোজ জানালেন, কোনো চরিত্র হাতে পেয়েই অভিনয় শুরু করেন না; বরং চরিত্রটির ভেতরের মানুষটিকে বুঝতে সময় নেন। তিনি বলেন, ‘ইতিহাসে স্নাতক করলেও অর্থনীতি আমার বিষয় ছিল না। তাই চিত্রনাট্য পাওয়ার পর জিডিপি, রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার, ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের মতো বিষয় নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করেছি। গবেষণার মাধ্যমেই ধীরে ধীরে চরিত্রটার ভেতরে প্রবেশ করি।’
ভেঙ্কিটারমননের চরিত্রে অভিনয়ের আগে তাঁর কিছু ভিডিও দেখেছেন এবং বিভিন্ন তথ্যপত্র পড়েছেন মনোজ। তবে কোনো আরবিআই কর্মকর্তার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেননি। ছাত্রজীবনে পরিচিত কয়েকজন আইএএস ও আইপিএস কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছেন। সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় তাঁরা কীভাবে ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাগত চাপের মধ্যে ভারসাম্য রাখেন, সেই পর্যবেক্ষণ চরিত্র নির্মাণে সহায়ক হয়েছে বলে জানান তিনি।

দক্ষিণ ভারতীয় ভেঙ্কিটারমননের ভাষার টান ও উচ্চারণও ছিল প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে বাস্তবতা ও গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে ভারসাম্য রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মনোজ। তাঁর ভাষায়, ‘ছবিটি মূলত হিন্দিভাষী দর্শকদের জন্য নির্মিত হলেও দক্ষিণ ভারতীয় দর্শকের অনুভূতিকেও সম্মান জানাতে হয়েছে। তাই চরিত্রের উচ্চারণে দক্ষিণ ভারতীয় ছাপ রাখা হলেও সেটিকে কখনো অতিরঞ্জিত করা হয়নি।’
ছবিটির পরিচালক হিসেবে শেষ মুহূর্তে যুক্ত হন চিন্ময় ডি মান্ডলেকর। মনোজই তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিলেন। কারণ, এর আগে ইন্সপেক্টর জেন্ডে প্রকল্পে একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল তাঁদের। মাত্র তিন মাসের মধ্যে নতুন করে গবেষণা করে চিত্রনাট্যের খসড়া তৈরি করেন চিন্ময়। সেই কাজ দেখে প্রযোজক বিপুল শাহও মুগ্ধ হন। তবে পরিচালনার পাশাপাশি অভিনয়েও তুখোড় চিন্ময়। তিনি মারাঠি ছবির দুনিয়ার এক পরিচিত নাম। মনোজের মতে, ‘একজন অভিনেতা যখন পরিচালকের দায়িত্ব নেন, তখন তিনি সহশিল্পীদের মানসিক অবস্থাও সহজে বুঝতে পারেন। ফলে শুটিং সেটে জটিল পরিস্থিতি সামলানো অনেক সহজ হয়।’

অর্থনীতির মতো জটিল বিষয়কে চলচ্চিত্রে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মনোজ বলেন, পরিচালক সব সময় মনে করিয়ে দিতেন, অর্থনীতি নয়, গল্পই ছবির কেন্দ্রবিন্দু। তাই তথ্যের সঙ্গে কোনো আপস না করেও ছবিটিকে দর্শকবান্ধব করে তোলার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। তাঁর বিশ্বাস, ‘ইতিহাস ও অর্থনীতির মতো বিষয় বইয়ের পাতার চেয়ে চলচ্চিত্রে অনেক সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।’

বাস্তব চরিত্রে অভিনয় করতে কেন এত আগ্রহী, তারও ব্যাখ্যা দেন মনোজ। তিনি বলেন, ‘বাস্তব মানুষের জীবন থেকেই সবচেয়ে শক্তিশালী গল্প উঠে আসে। চার্লস শোভরাজকে গ্রেপ্তার করা পুলিশ কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর জেন্ডের মতো চরিত্র নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি, বাস্তবের ঘটনা অনেক সময় কল্পনার চেয়েও নাটকীয়। সাধারণ দর্শকও সেই চরিত্রগুলোর সঙ্গে সহজে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারেন।’
নিজের অভিনয়দর্শন নিয়েও কথা বলেন এ অভিনেতা। তাঁর ভাষায়, ‘প্রতিদিনের জীবনে সাধারণ মানুষের মধ্যেই নতুন চরিত্র খুঁজে বেড়াই। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, দোকানের ক্যাশ কাউন্টারে বসা কর্মচারী কিংবা রাস্তায় চলতে থাকা কোনো অচেনা পথচারী—প্রত্যেকের মধ্যেই সম্ভাব্য চরিত্রের সন্ধান করি।’ তাঁর বিশ্বাস, একজন অভিনেতার সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষের জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা।
বক্স অফিসের প্রসঙ্গ উঠতেই মনোজের জবাব ছিল স্পষ্ট। ‘আমার চাপ কেবল অভিনয় পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। ছবির ব্যবসা বা আয়ের হিসাবকে আমি কখনো নিজের দায়িত্ব মনে করি না। আমার একমাত্র লক্ষ্য চরিত্রকে যতটা সম্ভব বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা।’ তাঁর মতে, কোনো ছবির শিল্পমানকে শুধু আয় দিয়ে বিচার করা যায় না।
বয়সে অনেক ছোট অভিনেত্রীর সঙ্গে বলিউড নায়কদের রোমান্সের বর্তমান প্রবণতা নিয়েও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন মনোজ। তিনি বলেন, ‘কে কার বিপরীতে অভিনয় করবেন, সেটি পরিচালকের সিদ্ধান্ত। গল্পের প্রয়োজনই এখানে মুখ্য।’ হাসতে হাসতেই যোগ করেন, ‘কাল এমনও হতে পারে যে ৭০ বছর বয়সী কোনো অভিনেত্রীর সঙ্গে আমি জুটি বাঁধলাম।’ অর্থাৎ বয়স নয়, চরিত্রই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একাধিক জাতীয় পুরস্কার ও পদ্মশ্রীর মতো সম্মান পেলেও সেগুলোকে চূড়ান্ত সাফল্য বলে মনে করেন না মনোজ বাজপেয়ী। তাঁর কথায়, ‘পুরস্কার পাওয়ার মুহূর্ত অবশ্যই আনন্দের। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষ পুরস্কারের তালিকা ভুলে যায়। শেষ পর্যন্ত দর্শকের মনে থেকে যায় একজন অভিনেতার কাজ এবং তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো।’