২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ঢাকার মোহাম্মদপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় সপ্তম শ্রেণির ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী রাকিব হাসান। দুই বছরেও সন্তান হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি বাবা আবুল খায়ের। লক্ষ্মীপুরের ১৬ শহীদের মধ্যে রাকিবই সবচেয়ে কম বয়সী। মামলার অভিযোগপত্র হলেও এখনো বিচারকাজ শেষ হয়নি।
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ইছাপুর গ্রামে লতাগুল্ম আর ঘাসে ছাওয়া একটি কবর। সেখানেই শুয়ে আছে মাত্র ১৩ বছরে জীবন থেমে যাওয়া রাকিব হাসান। ১৯ জুলাই তার মৃত্যুর দুই বছর পার হলো। তবে দুই বছরেও শোকের পাথর একটুও নড়েনি রাকিব হাসানের বাবা আবুল খায়েরের বুক থেকে। মুঠোফোনে ছেলের কথা উঠতেই দীর্ঘ নীরবতা। একপর্যায়ে ফুপিয়ে কান্নার শব্দ। অনেকক্ষণ পর বললেন, ‘বুকটা ভেঙে যায়।’
২০২৪ সালের জুলাই মাসের উত্তাল দিনগুলোর কথা ভুলতে পারেন না ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিদ্যুতের লাইনম্যান আবুল খায়ের। ঢাকার বেশ কয়েকটি স্থান পরিণত হয়েছিল রণক্ষেত্রে। এর মধ্যে কোটা সংস্কার থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হওয়া বিক্ষোভে জুলাই মাসজুড়েই উত্তাল ছিল মোহাম্মদপুর এলাকা। সেখানকারই আইটিজেড স্কুল অ্যান্ড কলেজে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত রাকিব। থাকত বাবা আবুল খায়ের ও স্নাতকপড়ুয়া বড় ভাই আবু রায়হানের সঙ্গে ওই এলাকার জাকির হোসেন রোডের এক কক্ষের একটি ভাড়া বাসায়।
আবুল খায়েরের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে রাকিব সবার ছোট, সবার আদরের। সেই আদরের ছেলেকে মা পারভীন আক্তারের কাছ থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন বাবা পড়াশোনার জন্য। রাজধানীর ভালো স্কুলে পড়বে বলে মা ছেলেকে যেতে দিয়েছিলেন। তবে মায়ের অভাব বুঝতে দিতেন না বাবা আবুল খায়ের। ছেলের জন্য নিজেই রান্না করতেন বলে জানালেন। সেই ছেলেকে আগলে রাখতে পারলেন না।
জুলাইয়ের সেই উত্তাল সময়ে বাবা আবুল খায়েরের কাছে একটা ফুটবলের জন্য বায়না ধরেছিল রাকিব। তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট ছেলে ছিল সে। বাবা প্রথমে ভেবেছিলেন, আন্দোলন, বিক্ষোভের আঁচ কিছুটা কমলে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ছেলেকে বল কিনে দেবেন। কিন্তু ছেলের বায়নার কাছে হার মেনে বলটা কিনেই দেন শেষে। তবে নিষেধ করেছিলেন মিছিল-মিটিং থাকলে বাইরে খেলতে যেতে। ১৯ জুলাই একটি নেভি ব্লু রঙের জার্সি আর হাফপ্যান্ট পরা অবস্থায় ঘরেই শেষবার ছেলেকে জীবিত দেখেন বাবা। সেদিন পরিস্থিতি খারাপ থাকায় খেলতে যেতে নিষেধ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আব্বু তুই আইজ বাইরে যাইস না।’ কিন্তু বিকেলের পর কোন ফাঁকে রাকিব বেরিয়ে যায়, তা বুঝতে পারেননি বাবা আবুল খায়ের। ছেলেকে বল কিনে দেওয়া নিয়ে এখনো আফসোস করেন তিনি।
সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলে বাবা ভেবেছিলেন, অন্য দিনের মতো খেলাধুলা শেষে ছেলে আবার ফিরে আসবে। কিন্তু মাগরিব পেরিয়ে এশার আজান হলেও রাকিবের কোনো খোঁজ মেলেনি। উদ্বিগ্ন হয়ে ছেলেকে খুঁজতে বের হন তিনি। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে থাকেন। প্রথমে মোহাম্মদপুরের সিটি হাসপাতালে যান। সেখান থেকে তাঁকে পাঠানো হয় জাতীয় স্নায়ুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। সেখানে পৌঁছে ছেলেকে আর জীবিত পাননি। হাসপাতালের মর্গে পড়ে ছিল রাকিবের নিথর দেহ।

পরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও বিভিন্নজনের কাছে খোঁজ নিয়ে আবুল খায়ের জানতে পারেন, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন একটি সড়কে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিল রাকিব। ওই স্থানে আন্দোলনকারী ছাত্র–জনতার উপস্থিতি ছিল। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
রাকিবের বাবা আবুল খায়ের ছেলের কথা বলতে গিয়ে কান্না থামাতে পারেন না। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেটার গোঁফ–দাঁড়িও গজায়নি। বড় আদরের ছিল। কোনো দিন গায়ে হাত তুলি নাই। সে ব্যাথা পাইলে আমারও গায়ে যন্ত্রণা হইত। সেই ছেলের মাথায় গুলি লাগল। কত কষ্ট পাইল। নিজের হাতে ওরে কবরে নামাইলাম। আমি কেন বাঁইচা আছি, জানি না।’
আবুল খায়েরের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে রাকিব সবার ছোট, সবার আদরের। সেই আদরের ছেলেকে মা পারভীন আক্তারের কাছ থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন বাবা পড়াশোনার জন্য। রাজধানীর ভালো স্কুলে পড়বে বলে মা ছেলেকে যেতে দিয়েছিলেন। তবে মায়ের অভাব বুঝতে দিতেন না বাবা আবুল খায়ের। ছেলের জন্য নিজেই রান্না করতেন বলে জানালেন। সেই ছেলেটাকে আগলে রাখতে পারলেন না।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাকিব হাসানসহ লক্ষ্মীপুর জেলার ১৬ জন শহীদ হয়েছেন। এর মধ্যে রাকিবই সবচেয়ে কম বয়সী। জেলার শহীদদের গেজেটে অবশ্য তার নাম লিপিবদ্ধ হয়েছে ‘রাকিব হোসেন’ হিসেবে। রাকিব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আবুল খায়েরের চাচাতো ভাই নুরুল আমিন বাদী হয়ে মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে চলতি মাসে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাকিব হাসানসহ লক্ষ্মীপুর জেলার ১৬ জন শহীদ হয়েছেন। এর মধ্যে রাকিবই সবচেয়ে কম বয়সী। জেলার শহীদদের গেজেটে অবশ্য তার নাম লিপিবদ্ধ হয়েছে রাকিব হোসেন হিসেবে। রাকিব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আবুল খায়েরের চাচাতো ভাই নুরুল আমিন বাদী হয়ে মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে চলতি মাসে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। অভিযোগপত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৮৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে এত দিনেও হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কেউ শাস্তি পায়নি দেখে হতাশ রাকিবের বাবা আবুল খায়ের। তিনি বলেন, ‘আমার তো কোনো শত্রু ছিল না। ছেলেকটারও কত বয়স। আমার তো সব শেষ। কিছুতেই এই ক্ষতি পূরণ হইব না।’

জেলার ১৬ জন শহীদ
গেজেট অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে লক্ষ্মীপুর জেলার ১৬ জন প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে ৬ জন শিক্ষার্থী, ৪ জন শ্রমিক, ১ জন অটোরিকশা চালক এবং ৫ জন ব্যবসায়ী। শহীদদের বেশির ভাগই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য। এর মধ্যে রায়পুর উপজেলার ২ জন, রামগঞ্জের ৬ জন, লক্ষ্মীপুর সদরের ৫ জন, রামগতির ২ জন ও কমলনগর উপজেলার ১ জন বাসিন্দা রয়েছেন।
জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সম্রাট খীসা বলেন, ‘শহীদের গেজেট করা হয়েছে। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর ক্ষতি কখনোই পূরণ হবার নয়।’