সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / চীনের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার জিতলেন একজন ডেলিভারিম্যান
চীনের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার জিতলেন একজন ডেলিভারিম্যান

চীনের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার জিতলেন একজন ডেলিভারিম্যান

‘পৃথিবীতে যদি পঞ্চম কোনো ঋতু থাকত, তবে তা নিশ্চয়ই হতো ডেলিভারি রাইডারদের বসন্ত।’ এ লাইন দিয়ে শেষ হয়েছে ওয়াং জিবিংয়ের ‘লো ফ্লাইট’ কাব্যগ্রন্থের মূল কবিতা। চীনের এই ফুড ডেলিভারি রাইডার তাঁর এ বইয়ের জন্য দেশটির অন্যতম সাহিত্য সম্মাননা ‘লু সুন সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেছেন।

পূর্ব জিয়াংসু প্রদেশে ৫৬ বছর বয়সী ওয়াং দিনে খাবার পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি পথের সাধারণ মানুষ ও চারপাশের জীবন থেকে কবিতার অনুপ্রেরণা খুঁজে পান। ডেলিভারিকর্মীদের প্রতিদিনের লড়াই, কষ্ট আর স্বপ্নের গল্পগুলোকেই তিনি তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানায়, ‘লো ফ্লাইট’ বইটি লেখার আগে ওয়াং ১৪০ জনের বেশি সহকর্মী ডেলিভারি রাইডারের সাক্ষাৎকার নেন। পাশাপাশি প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে সংগৃহীত ৬০টির বেশি উত্তরের ওপর ভিত্তি করে তিনি এ সাহিত্যকর্ম সম্পন্ন করেন।

চায়না রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক লু সুন সাহিত্য পুরস্কারের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সহজ-সরল কিন্তু অত্যন্ত আন্তরিক ভাষায় লেখা এই কবিতাগুলো ডেলিভারিকর্মীদের ভেতরের জীবনের এক জীবন্ত ছবি তুলে ধরে। এটি সাধারণ মানুষের টিকে থাকার লড়াই ও আশার গল্পকে প্রকাশ করে।

১৯৯৬ সালে চীনের বিখ্যাত ঔপন্যাসিক লু সুনের স্মরণে এ পুরস্কার চালু করা হয়, যা দেশটির অন্যতম শীর্ষ সাহিত্য সম্মাননা। ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই ঘোষিত বিজয়ীদের তালিকায় কবিতা বিভাগে সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পায় ওয়াং জিবিংয়ের ‘লো ফ্লাইট’। বইটির মূল কবিতাটি শুরু হয় এভাবে, ‘কে বলে ডানা মেললেই উঁচুতে উড়তে হবে? নিচুতে ওড়াও তো ওড়া।’

কবিতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য লাইন হলো, ‘ব্যস্ত মানুষ এক ঘণ্টা থেকে ৬১ মিনিট নিংড়ে নেয়।’ এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার চাপ এবং ডেলিভারিকর্মীদের নিরলস পরিশ্রমের বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

বর্তমানে চীনে প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ডেলিভারিকর্মী ও রাইড শেয়ারিং চালকের মতো নতুন ধরনের পেশায় যুক্ত আছেন। ওয়াং জিবিংয়ের কবিতাগুলো মূলত এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের কষ্ট ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকেই মানুষের সামনে নিয়ে এসেছে।

চীনা গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াং জিবিংয়ের জন্ম জিয়াংসু প্রদেশের শুঝৌ শহরের একটি দরিদ্র পরিবারে। পরিবারের আর্থিক কষ্টের কারণে খুব ছোটবেলাতেই তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। পেটের তাগিদে তিনি রাজমিস্ত্রির কাজ থেকে শুরু করে আবর্জনা কুড়ানোর মতো নানা ধরনের কাজ করেছেন। ২০১৯ সালে তিনি ফুড ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ শুরু করেন। কুনশান শহর ও এর আশপাশের এলাকায় খাবার পৌঁছে দেন তিনি।

পড়াশোনা না এগোলেও বই পড়ার প্রতি ওয়াংয়ের টান ছিল প্রবল। প্রতিদিনের ডেলিভারি দেওয়ার অভিজ্ঞতা ও নিজের জীবনযুদ্ধের গল্প থেকে তিনি বছরের পর বছর ধরে ছয় হাজারের বেশি কবিতা রচনা করেছেন।

২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘লো ফ্লাইট’ ওয়াংয়ের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। এর আগে ২০২৩ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ম্যান ইন আ হারি: পোয়েমস অব আ ফুড ডেলিভারি রাইডার’ এবং দ্বিতীয় বই ‘আই ক্ল্যামজিলি লাভ দিস ওয়ার্ল্ড’ প্রকাশিত হয়।

সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার পর ওয়াং জানান, এই কবিতাগুলো পড়ার পর মানুষ যেন ডেলিভারিকর্মীদের কষ্ট বুঝতে পারেন এবং তাঁদের প্রতি আরও একটু ধৈর্যশীল ও সহানুভূতিশীল হন। ৬০ বছর বয়স হওয়ার আগপর্যন্ত, অর্থাৎ আরও অন্তত তিন বছর তিনি ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে চান।

সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসকে ওয়াং বলেন, ‘সংসার চালানোর জন্য এখন আর এই কাজ করার দরকার নেই, তবে কাজের এই পরিবেশ আমার ভালো লাগে এবং এতে শরীরও ফিট থাকে। আমি একদম সাধারণ জীবন যাপন করতে চাই। এই বড় পুরস্কার পাওয়ার পরও আমার ভেতরের মানুষটি একই থাকবে। আমি শুধু লিখে যেতে চাই এবং সাহিত্যের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনের গল্প ফুটিয়ে তুলতে চাই।’

ওয়াং জিবিংয়ের কবিতা চীনের তরুণ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মন জয় করেছে। তাঁর এই সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার খবরে সবাই খুব খুশি। চীনের জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ওয়েইবোতে এক পাঠক লিখেছেন, খাবার পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি এমন চমৎকার কবিতা লিখে পুরস্কার পাওয়াটা আসলেই দারুণ ব্যাপার। আরেকজন লিখেছেন, তিনি নিজের যোগ্যতায় এই পুরস্কার অর্জন করেছেন।

চলতি বছরের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রকাশনা সংস্থা থেকে ওয়াংয়ের ‘লো ফ্লাইট’ বইটির ইংরেজি অনুবাদ বের হতে যাচ্ছে।

চীনে ইদানীং সাধারণ দিনমজুর বা শ্রমজীবী মানুষের মধ্য থেকে অনেক নতুন লেখক উঠে আসছেন। এর আগে পার্সেল পৌঁছে দেওয়ার কাজ করা হু আনিয়ানের ২০২৩ সালের বই ‘আই ডেলিভার পার্সেলস ইন বেইজিং’ বিশ্বজুড়ে বেশ পরিচিতি পায়। পরে ২০২৫ সালে বইটি ইংরেজিতেও ছাপা হয়।

এমন আরও কয়েকজন জনপ্রিয় লেখক হলেন সাবেক খনিশ্রমিক চেন নিয়ানশি। তিনি সাধারণ শ্রমিকদের জীবনের কষ্ট নিয়ে লেখেন। আরেকজন হলেন সাবেক কৃষক ইউ শিউহুয়া, যাঁর কবিতায় উঠে এসেছে ভালোবাসা, ইচ্ছা ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেঁচে থাকার নানা কথা।

সূত্র: ইয়াহু নিউজ ও চ্যানেল নিউজ এশিয়া

About Editor Todaynews24

Check Also

প্রয়াত স্বামীর কণ্ঠ শুনতে প্রতিদিন যেতেন মেট্রোস্টেশনে, তারপর...

প্রয়াত স্বামীর কণ্ঠ শুনতে প্রতিদিন যেতেন মেট্রোস্টেশনে, তারপর…

লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ের এক স্টেশনে ট্রেন ঢোকার আগে একটা পরিচিত ঘোষণা ভেসে আসে, ‘মাইন্ড দ্য গ্যাপ’। বাংলায় যার অর্থ, ট্রেন আর প্ল্যাটফর্মের মাঝখানের ফাঁকটির দিকে খেয়াল রাখুন। প্রতিদিন লাখো যাত্রী এই ঘোষণা শোনেন। বেশির ভাগের কাছেই এটি কেবল একটি নিরাপত্তাবার্তা। ট্রেনে ওঠার তাড়ায় কজনই–বা কণ্ঠটা আলাদা করে মনে রাখেন? কিন্তু একজন নারীর কাছে এ কয়েকটি…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *