সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / গুঁড়া সাবানের বাজারে নীরব বিপ্লব
গুঁড়া সাবানের বাজারে নীরব বিপ্লব

গুঁড়া সাবানের বাজারে নীরব বিপ্লব

পরিধানের বস্ত্র চাই পরিচ্ছন্ন। এই পরিচ্ছন্নতা ঘিরে আঠারো শতক থেকেই গড়ে উঠেছে ব্যবসা। বর্তমানে এই ব্যবসা প্রযুক্তি ও যন্ত্রের ব্যবহারে আরও মানসম্পন্ন হয়ে উঠছে। এর ছোঁয়া পৌঁছেছে প্রান্তিক পর্যায় থেকে অভিজাত পরিবারের দোরগোড়ায়। সাধারণ মানুষের নিত্যব্যবহার্য এই পণ্যের বাজার গত পাঁচ বছরে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।

ডিটারজেন্ট পাউডার এখন পরিণত হয়েছে দেশের করপোরেট খাতের অন্যতম সফল এক উদ্ভাবনে। গুণগত মান, পরিবেশবান্ধব উৎপাদনপ্রক্রিয়া ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অনন্য নজির স্থাপন করে কোম্পানিগুলো মানোন্নয়ন করে পণ্যটি বাজারজাত করছে। এই খাতে দেশি-বিদেশি কোম্পানি দিন দিন যত বাড়ছে, তত প্রতিযোগিতা বৃদ্ধিতে মানোন্নয়ন হচ্ছে। উন্নত দেশের কাতারে তাল মেলাতে এবং যৌক্তিক ব্যবহার বাড়াতে হলে কোম্পানিগুলোকে এ বিষয়ে আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বিভিন্ন কোম্পানির বিপণন কর্মকর্তারা।

বাজারের আকার ও রূপান্তর—দেশের প্রচলিত কোম্পানিগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ডিটারজেন্টের বাজারের আকার ৪ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এই বাজারে পণ্যের মূল্য হিসাবে গত পাঁচ বছরে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বর্তমানে দেশের বাজারে ডিটারজেন্ট সরবরাহের পরিমাণ প্রায় দুই লাখ টনে পৌঁছেছে। এই বাজারে আগে কাপড় ধোয়ার সাবানের ব্যবহার বেশি ছিল, এখন তা কমেছে। এর পরিবর্তে ডিটারজেন্টের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ভবিষ্যতের বাজারে তরল ডিটারজেন্টের (লিকুইড) সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

একটি বহুজাতিক কোম্পানির ২০২০ সালের বাজার জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এই পণ্যের বাজারের আকার ছিল ৭৭ হাজার ৩৮২ টন। তখন তা টাকার অঙ্কে ছিল ২ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা। ওই সময়ে বার্ষিক বিক্রির প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ শতাংশের মতো। 

বহুজাতিক ও দেশীয় কোম্পানির মেলবন্ধন

এই বাজারে দীর্ঘদিন ধরে বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভার বড় অংশ সরবরাহ করে আসছে। দু–তিন দশক ধরে দেশীয় কোম্পানির অংশগ্রহণও বাড়ছে। আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল এই বাজারে এখন নীরব বিপ্লব ঘটছে। তবু এই বাজারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ধরে রেখেছে বহুজাতিক কোম্পানিটি। ইউনিলিভারসহ দেশের প্রথম ডিটারজেন্ট কোম্পানি কোহিনুর কেমিক্যাল, স্কয়ার টয়লেট্রিজ, কল্লোল গ্রুপ ও বিদেশি কোম্পানি আরএসপিএল এই বাজারের ৯৫ শতাংশ পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করছে। অন্য সব ব্র্যান্ড মিলে বাকি ৫ শতাংশ সরবরাহ করছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি ইউনিলিভার ১৯৬২ সালে কারখানা স্থাপন করে ১৯৬৪ সালে উৎপাদনে আসে। শুরুতে এই কোম্পানির ব্র্যান্ড ছিল সানলাইট ও লাইফবয়। পরবর্তী সময়ে হুইল সাবানের নামে পরিচিতি বাড়ে। সাবান থেকে তারা ডিটারজেন্ট পাউডার উৎপাদনে আসে ১৯৯৭ সালে। এই কোম্পানির তিনটি ডিটারজেন্ট ব্র্যান্ড রয়েছে—হুইল, রিন ও সার্ফ এক্সেল। প্রতিটি ব্র্যান্ড ক্যাটাগরি অনুযায়ী বাজারের শীর্ষে রয়েছে।

ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে ‘জেট’

দেশের বাজারে প্রথম ১৯৬৮ সালে কোহিনুর কেমিক্যালের কারখানায় স্প্রে-ড্রাই প্রযুক্তির ডিটারজেন্ট পাউডার ‘জেট’ উৎপাদন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৬ সালে কল্লোল গ্রুপ ইতালির আধুনিক উৎপাদন যন্ত্রপাতিসহ ঐতিহ্যবাহী এই জেট ব্র্যান্ড ও এর উৎপাদন কার্যক্রম অধিগ্রহণ করে। সেই থেকে দুই দশকের বেশি সময় ধরে কল্লোল গ্রুপ সুনামের সঙ্গে জেট ডিটারজেন্ট উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছে। এ বিষয়ে কল্লোল গ্রুপ অফ কোম্পানিজের সিনিয়র মার্কেটিং ম্যানেজার ইশরাত চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, অধিগ্রহণের পর এই গ্রুপ জেটের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে উৎপাদন প্রযুক্তি ও পণ্যের মানে ব্যাপক উন্নয়ন এনেছে। বর্তমানে জেট ডিটারজেন্ট পাউডার জাপানের উন্নত প্রযুক্তি ও মাল্টি-এনজাইম ফর্মুলায় প্রস্তুত করা হয়, যা কাপড় পরিষ্কারের পাশাপাশি কাপড়ের যত্ন ও বুননের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। জেটের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, পণ্যের নির্ভরযোগ্য মান ও ভোক্তার আস্থা অর্জন।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ডিটারজেন্ট তৈরির মূল উপাদানগুলো (যেমন: ল্যাবসা, সোডা ও অ্যাশ) মূলত আমদানিনির্ভর। ডলারের দাম ও আন্তর্জাতিক বাজারে এসব কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত দুই বছরে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়লেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে মানসম্পন্ন পণ্য পৌঁছে দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশীয় কোম্পানিগুলো ধারাবাহিকভাবে উৎপাদনপ্রক্রিয়ার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উচ্চমানসম্পন্ন কাঁচামালের মাধ্যমে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার চেষ্টা করছে, যাতে কাপড়ের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভোক্তার প্রকৃত সাশ্রয় হয়। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতকারক ও বিপণনকারী বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের বিপণন ব্যবস্থাপক হোসেন মোহাম্মাদ সাররাম বলেন, কোভিড-পরবর্তী দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো ছিল না। কিন্তু ওই সময়ের কিছুদিন পরে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম বাড়াতে হয়েছে। এরপর তিন বছর দামে স্থিতিশীলতা ধরে রেখেছে কোম্পানিগুলো। ফলে গত পাঁচ বছরে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাজার বাড়লেও তা কেবল টাকার অঙ্কে বেড়েছে। পরিমাণের দিক থেকে মানুষের মাথাপিছু ডিটারজেন্ট ব্যবহার বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ হারে। তিনি আরও জানান, ডিটারজেন্ট উৎপাদনের বেশির ভাগ কাঁচামাল আমদানিনির্ভর। এর মৌলিক কাঁচামাল ল্যাবসা আসে তেল থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই কাঁচামালের সরবরাহ কমেছে, যা কোম্পানিগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিন বছর পণ্যের দাম ধরে রাখা হলেও এবার বৈশ্বিক কারণে দাম বাড়াতে হয়েছে।

তরল ডিটারজেন্ট: ভবিষ্যতের বাজার

স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের বিপণন বিভাগের প্রধান ড. জেসমিন জামান বলেন, দেশের ডিটারজেন্টের বাজার বড় হচ্ছে। একই সঙ্গে তরল ডিটারজেন্টের ব্যবহারও বাড়ছে। লন্ড্রি সাবানের ব্যবহার কমছে। তরল ডিটারজেন্টের বাজার প্রবৃদ্ধি বেশ ভালো। গৃহকর্মীরা দ্রুত কাপড় ধুতে তরল দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং ওয়াশিং মেশিনে এর ব্যবহার বেশি হচ্ছে। তবে বেশি ময়লা বা দাগ হলে গুঁড়ো ডিটারজেন্ট বা সাবান ব্যবহার করা হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে তরল ডিটারজেন্টের ব্যবহার আরও অনেক বেশি হবে এবং বাজার বেশ বড় হবে। লন্ড্রি ক্যাটাগরির পণ্যের বাজার ছয় হাজার কোটি টাকার হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ডিটারজেন্টের বাজার রয়েছে। এই বাজারে ইউনিলিভার, কল্লোল গ্রুপ, স্কয়ারসহ বিভিন্ন কোম্পানির নানা ব্র্যান্ডের ভালো প্রবৃদ্ধি রয়েছে। জেসমিন জামান আরও বলেন, সার্বিকভাবে ডিটারজেন্টের বাজারমূল্যের দিক থেকে প্রবৃদ্ধি বেশ ভালো রয়েছে। সারা দেশে ডিটারজেন্টের ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রামে ৬৫ শতাংশ ও শহরে ৩৫ শতাংশ। দেশের মোট জনসংখ্যার বেশি মানুষ গ্রামে বসবাস করেন, এ কারণে গ্রামে ব্যবহার বেশি হয়।

দেশীয় ব্র্যান্ডের অংশগ্রহণ বাড়ছে

দেশের ডিটারজেন্ট ও ক্লিনিং পণ্যের বাজারে একসময় পুরোপুরি বিদেশি ও বহুজাতিক ব্র্যান্ডনির্ভর থাকলেও, বর্তমানে দৃশ্যপট দ্রুত বদলাচ্ছে। মানসম্মত উৎপাদন, সাশ্রয়ী মূল্য এবং স্থানীয় ভোক্তাদের চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে বাজারের এক বড় অংশীদার হচ্ছে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো।

দেশীয় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন উন্নত কেমিক্যাল ফর্মুলেশন ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে দাগ দূরীকরণে কার্যকর এবং কাপড়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করে—এমন ডিটারজেন্ট বাজারজাত করছে। শুধু তা–ই নয়, ছোট ও সাশ্রয়ী প্যাকেজিং এবং পরিবেশবান্ধব উপাদানের ব্যবহার সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখছে। ই-কমার্স ও সুপারশপ থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুদিদোকানগুলোতেও দেশীয় ব্র্যান্ডের সহজলভ্যতা বেড়েছে।

ভোক্তাদের এই দেশীয় পণ্যাভিমুখিতা শুধু আমদানিনির্ভরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার খরচই কমাচ্ছে না; বরং স্থানীয় কাঁচামাল খাত ও প্যাকেজিংশিল্পকে সমৃদ্ধ করছে। একই সঙ্গে সৃষ্টি হচ্ছে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান। মান নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর বিপণন বজায় রাখতে পারলে দেশীয় ডিটারজেন্টশিল্প অচিরেই দেশের বাজারে আরও ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

আগামীর পথে

শুধু দেশের বাজার নয়, আন্তর্জাতিক মানের আইএসও এবং অন্যান্য সনদ অর্জনকারী বিভিন্ন ডিটারজেন্ট কোম্পানি আধুনিক পণ্য বাজারজাত করছে। কাপড় এখন শুধু ব্যবহার্য বস্তু নয়, এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও ব্যক্তিত্বের অংশ। তাই শুধু পরিষ্কার নয়, উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে কাপড়ের দীর্ঘমেয়াদি যত্ন নিশ্চিত করাই এখন কোম্পানিগুলোর লক্ষ্য। পরিবেশ বাঁচিয়ে এবং অর্থনৈতিক বৈরিতা জয় করে বহুজাতিক, বিদেশি ও দেশি কোম্পানিগুলো এক সুস্থ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হচ্ছে, যা দেশের ডিটারজেন্ট বাজারে এক নীরব ও যুগান্তকারী বিপ্লবের সূচনা করেছে।

About Editor Todaynews24

Check Also

শাকিব খানকে নিয়ে যে পরিকল্পনা করেছে রায়হান রাফি

শাকিব খানকে নিয়ে যে পরিকল্পনা করেছে রায়হান রাফি

বিনোদনজগতের তারকাদের সমসাময়িক কাজ, সাফল্য আর স্বপ্ন-পরিকল্পনার গল্প নিয়ে প্রথম আলো ডটকমের নিয়মিত আয়োজন ‘মেরিল ক্যাফে লাইভ’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *