কিংবদন্তি খেলোয়াড়েরা কি ভালো কোচ হতে পারেন? কেউ পারেন, কেউ পারেন না। জিনেদিন জিদান সেই পারাদের দলে।
না পারাদের উদাহরণ আছে ঢের। ডিয়েগো ম্যারাডোনার কথাই ধরুন। খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্ব মাতিয়েছেন, কিন্তু কোচ হিসেবে কিছুই জিততে পারেননি। রিস্টো স্টয়চকভ, থিয়েরি অঁরি, ওয়েইন রুনিরাও থাকবেন সে তালিকায়। ববি চার্লটন, মারিও কেম্পেসের নামও আসতে পারে, কিন্তু জিদানের বিষয়টি ভিন্ন।
১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী জিদান কোচ হিসেবে শুধু সফল নন, ভীষণ সফল। রিয়াল মাদ্রিদে দুই মেয়াদে মোট ৪ বছরে ১১টি শিরোপা জিতেছেন। আজ ফ্রান্সের দায়িত্ব নেওয়ার আগে কোচ জিদানের যোগ্যতা নিয়ে তাই প্রশ্ন ওঠার সুযোগ নেই, কিন্তু একসময় উঠেছিল।
সেটা ২০১৬ সালে। দুই বছর রিয়ালের রিজার্ভ দলের কোচের দায়িত্ব পালনের পর যখন মূল দলের কোচের দায়িত্ব নিলেন কিংবদন্তি। প্রশ্ন উঠেছিল, খেলোয়াড় হিসেবে জিদানের যে খ্যাতি সেটা ডাগআউটে অনূদিত করতে পারবেন কি?
পক্ষে-বিপক্ষে তখন এ নিয়ে বিতর্কের মাঝেই ছোট একটি ঘটনা জানানো যায়। সে সময় রিয়ালের রিজার্ভ দলে ছিলেন স্প্যানিশ ডিফেন্ডার ডিয়েগো লরেন্তে। রিজার্ভ দল ছাড়তে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু জিদান মূল দলের কোচ হবেন জানার পর থেকে যান।
জিদানের ওপর ঠিক এভাবেই আস্থা রেখেছিল রিয়াল। রিজার্ভ দলের আগে কোচিংয়ের ছিটেফোঁটা অভিজ্ঞতাও ছিল না ফরাসি কিংবদন্তির। এমনকি রিয়ালের রিজার্ভ দলের কোচ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স তাঁর নেই বলেও সে সময় অভিযোগ তোলেন স্পেন ন্যাশনাল ফুটবল কোচ এডুকেশন সেন্টারের (সিইএনএএফই) পরিচালক মিগুয়েল গালান।
কিন্তু রিয়াল এসব কানে তোলেনি। ২০১৬ সালের ৪ জানুয়ারি রাফায়েল বেনিতেজকে ছাঁটাই করে সেদিনই জিদানকে আড়াই বছরের চুক্তিতে মূল দলের কোচ বানায় রিয়াল।
বাকি গল্প সবারই জানা। দুটি করে উয়েফা সুপার কাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের ট্রফি জয়ের পাশাপাশি লা লিগা ও স্প্যানিশ সুপার কাপও জেতেন। তবে জিদানের আসল ‘ম্যাজিক’ দেখা গিয়েছিল চ্যাম্পিয়নস লিগে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, করিম বেনজেমা, লুকা মদরিচদের নিয়ে ইতিহাসের প্রথম কোচ হিসেবে জেতেন টানা তিন শিরোপা।
২০১৮ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পাঁচ দিন পর রিয়ালের দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেন জিদান। তখন কারণ হিসেবে বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, এই দলের জয়ের ধারা বজায় রাখা উচিত, তবে পরিবর্তনেরও প্রয়োজন আছে। দরকার নতুন একটি কণ্ঠস্বর এবং ভিন্ন এক ফুটবল দর্শনের। সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই এটা সঠিক সময়—আমার জন্য, দলের জন্য এবং ক্লাবের জন্যও।’

রিয়ালকে আবারও জিদানের দ্বারস্থ হতে হয় ২০১৯ সালে। চ্যাম্পিয়নস লিগ, লা লিগা ও কোপা দেল রে থেকে বিদায় নেওয়ার পর সান্তিয়াগো সোলারিকে ছাঁটাই করে দ্বিতীয় মেয়াদে ফরাসি কিংবদন্তিকে ফেরায় মাদ্রিদের ক্লাবটি। কোভিড মহামারির সে সময়ে রিয়ালে পালাবদল চলছিল।
রোনালদো ক্লাব ছেড়েছেন তত দিনে। প্রথম মেয়াদের মতো সাফল্যও পাননি সেই মেয়াদে। জিতেছেন শুধু লা লিগা ও স্প্যানিশ সুপার কাপ। ২০২০-২১ মৌসুম কেটেছে ট্রফিশূন্য। ২০২১ সালের ২৭ মে রিয়ালকে বিদায় বলে কোচের দায়িত্ব ছাড়েন জিদান।
খেলোয়াড় হিসেবে রিয়ালের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন জিদান। কোচ হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রাণের সে ক্লাবকে বিদায় বলার কারণটা স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘এএস’কে পাঠানো চিঠিতে ব্যাখ্যা করেন কিংবদন্তি, ‘আমি ক্লাব ছেড়েছি, কিন্তু কখনোই অনুশীলনে হাঁপিয়ে উঠিনি। ২০১৮ সালের মে মাসে ক্লাব ছেড়েছিলাম। তখন আমার মনে হয়েছে, আড়াই বছরের সাফল্য এবং এত শিরোপার পর দলকে উদ্বুদ্ধ করতে নতুন কাউকে দরকার, কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। এবার আমি ক্লাব ছাড়ছি, কারণ, ক্লাব আমার ওপর সেভাবে আস্থা রাখতে পারছিল না।’
পরবর্তী পাঁচ বছরে জিদান আর কোনো দলের দায়িত্ব নেননি। ব্যাপারটা মোটামুটি ‘ওপেন সিক্রেট’ ছিল যে ফ্রান্সের দায়িত্ব নিতে দিদিয়ের দেশমের প্রস্থানের অপেক্ষায় আছেন জিদান। এবার বিশ্বকাপে ফরাসি অভিযান শেষে দেশমের বিদায়ের পর ফ্রান্স জাতীয় দলে শুরু হলো জিদান-অধ্যায়।

সেই অধ্যায়ে কেমন করতে পারেন জিদান?
এমনিতে সাধারণ ধারণা হলো রিয়ালে কৌশলগত জ্ঞান মাঠে সফলভাবে ফলানোর পাশাপাশি ভাগ্যও সহায় হয়েছিল জিদানের। পাশাপাশি ছিল দারুণ একটি স্কোয়াড, যেটা এখন ফ্রান্স দলও। বুদ্ধিদীপ্ত ফরমেশন, যেটা দরকারে পাল্টাতে পারেন এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলাতে পছন্দ করেন জিদান। ড্রেসিংরুমে খেলোয়াড়দেরও এক সুতোয় বেঁধে রাখার ক্ষমতা আছে তাঁর। সে জন্য জিদানের কোচিংয়ের ধারাকে অনেকে কার্লো আনচেলত্তির সঙ্গে তুলনা করেন।
এখন জিদান ফ্রান্সে কেমন করবেন, সেটা সময়ই বলে দেবে।