বাংলাদেশ থেকে ৫ সপ্তাহের ছুটি কাটিয়ে এসে আজই অফিসে জয়েন করলাম। বাংলাদেশ ট্যুরটাও খুব যে ভালো ছিল, তা নয়। দেশে যাওয়ার এক দিন পরই (চাঁদরাতে) আমার নিকটতম খালাকে হারিয়েছি, ওই শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতে কানাডা ফেরার সময় হয়ে গেছে।
আমার ছোট ছেলেটার (জিবরীল) শরীর টা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। বাংলাদেশ থেকে ফিরে আজকেই প্রথম অফিস শুরু করলাম। আমি অফিস থেকে বেশ কয়েক বার ফোন করে খোঁজখবর নিলাম।
আজ বিকেলে ফ্যামিলি ডাক্তারের আপয়েনমেন্ট আছে। জিবরীল অ্যাজম্যাটিক। আমার একটু টেনশন হচ্ছে। বিকেল পর্যন্ত ছেলেটার শরীর ভালো যাবে তো? আজ তাকে স্কুলে দিইনি, বাবার সঙ্গে বাসায় আছে।
অফিস শেষ হতেই আমার কাছে কল এল। জিবরীলের অবস্থা ভালো নয় । তাকে ইমার্জেন্সিতে নিতে হবে। আমিও চললাম। বুঝতে পারছিলাম, জিবরীলের অক্সিজেনের লেভেল কমছে। আমার ভয়, টেনশন, প্রার্থনা, জিবরীলকে সান্ত্বনা সবই চলছে।
ইমারজেন্সিতে আসামাত্র ওরা ওর অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গেই এডমিট করে দিল, ৩ জন নার্স ৪ জন ডাক্তার চলে এল। বুঝলাম, সত্যি আমার ছেলেটার অবস্থা ভীষণ খারাপ। আমার ভয় লাগছে। সঙ্গে সঙ্গেই অক্সিজেন দিল। আমাকে বলল, ওকে অ্যাম্বুলেন্সে আনা উচিত ছিল, তাহলে আরও আগে অক্সিজেন সাপোর্ট পেত।
কনটিনিয়াস মনিটরিং চলছে, শার্ট খুলে ফেলেছে, ওর শ্বাসপ্রশ্বাস দেখছে।
আইভিতে একটার পর একটা মেডিকেশন চলছে।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে আমাকে বলল, ‘আমরা তাকে আরও কয়েক ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখার পরিকল্পনা করছি, সে এখনো স্থিতিশীল নয়। প্রয়োজন হলে তাকে জিম প্যাটিসনের এর ওপরের তলায় ভর্তি করা হবে।’
আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু আমার সৃষ্টিকর্তার প্রতি প্রচণ্ড বিশ্বাস আছে, আমি জানি উনি আমার পরীক্ষা নিচ্ছেন। আমি ধৈর্যর সঙ্গে দোয়া করছি।
রাতে বা দিনে জিবরীল ২-৩ ঘণ্টা টানা ঘুমাতে পারে না। কিছুক্ষণ পরপর এসে ওষুধ দেয়। ওর সঙ্গে সঙ্গে আমিও জেগে থাকি। আর সারা দিন তো সব কিছু করা লাগে।
ইনশা আল্লাহ জিবরীল সুস্থ হবে!
একটু পর জিবরীল আমাকে কাছে ডেকে বলল, ‘এম আই ডায়িং? ইফ আই আম, দেন ডোন্ট ক্রাই ফর মি। মাম, আই লাভ ইউ, আই প্রেফার ইউ উইল লিভ লঙ্গ লাইফ।’
আমি স্তব্ধ হয়ে ওর দিকে তাকালাম আর মনিটরের দিকে তাকালাম, অক্সিজেন লেভেল এখনো নিয়ন্ত্রণে নেই। আমি বললাম, ‘না বাবা, আল্লাহ তোমাকে অনেক লাভ করে, ইনশা আল্লাহ তুমি ভালো হয়ে যাবে, তুমি তো আমার ব্রেভ কিড, মাই লায়ন।’
এই দিক দিয়ে সব রকমের টেস্ট, মেডিকেশন চলছে।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তাররা, নার্সরা এসে সব রকম তথ্য দিচ্ছে।
আনুমানিক রাত ২টার দিকে ডাক্তার রা আমাকে জানাল জিবরীলকে ৩ তলার পাঠানো হবে কেবিন। তিনতলায় ২৩২১ কেবিনটা আমাদের জন্য বরাদ্দ করা হলো। কেবিনে আনার আগে থেকেই জিবরীলের ঘুমাচ্ছে। জিবরীল অসুস্থ শুনে শরীফ ভাই ছুটে এসেছেন ওকে দেখতে।
কেবিন দেখে আমার মন কিছুটা শান্ত হলো। ছোট্ট জিবরীল একটু বিশ্রাম নিতে পারবে। এই কেবিনের ম্যাজিক পার্টটা হচ্ছে, জানালা দিয়ে সাসকাচুয়ান রিভার, দুটি ব্রিজ, রিভারে থাকা প্রমোদতরি, বিশাল নীল আকাশ, বনভূমি সব দেখা যায়। এককথায়, সিটি ভিউ দেখা যায়।
এবার আসি, আমাদের ৬ দিনের জীবন–যাপন কেবিন নং ২৩২১ এ।
১ম রাত—প্রতি ঘণ্টায় জিবরীলকে নেবুলাইজ করা হলো, কিছুক্ষণ পর সব ভাইটাল পরীক্ষা করা হচ্ছে। অক্সিজেন মাস্ক তো চলছে।
আমার বড় ছেলেটা বাসায় একা থাকবে তাই আমার বরকে রাতে বাসায় পাঠিয়ে দিচ্ছি।
শুরু হলো আমার ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়া আমার ছোট মানুষ টাকে। ডাক্তার, নার্স, রেসিডেন্ট ( স্টুডেন্ট ডাক্তার) সবাই খুব চিন্তিত।
মায়ের মন খুব অস্থির, কিন্তু শান্ত আমার মুখ।
জিবরীলকে বোঝানোর চেষ্টা করছি, ‘কিচ্ছু হয়নি তার’।
প্রথম রাত সারা রাতই জেগে ছিলাম।
পরদিন সকালে আবার সব পরীক্ষা–নিরীক্ষা হচ্ছে। জিবরীল রাজী হচ্ছে না ব্লাড টেস্ট করতে। অনেক বুঝিয়ে রাজি করালাম।
কিছুক্ষণ পর ডক্টর উইপ আর ডক্টর মুহাম্মদ এল সঙ্গে আরও তিনজন ডাক্তার। ভিজিট শেষে বলল, উনাদের পরিকল্পনা, ওকে কয়েক দিন হাসপাতালে রাখতে হবে। অক্সিজেন লেবেল এখনো নিয়ে খুব চিন্তিত।

দ্বিতীয় দিনে ২৪ ঘণ্টায় ২৪ বার নেবুলাইজ করেছে। এজমার ওষুধ দিচ্ছে। সারা দিন আমার ওকে যত্ন নেওয়ার সময় কাটছে।
বিকেল বেলায় সিনথি ভাবী, সালেহীন ভাই আসলো আমাদের জন্য খাবার নিয়ে, সঙ্গে আছে উনাদের ছোট্ট ছেলে মিশান। মিশান জিবরীলের বন্ধু। দুজন দুজনকে দেখে খুব খুশি হলো। জিবরীল খুব দুর্বল আর অসুস্থ ছিল তাই দেখে সবার খুব মন খারাপ ছিল।
৩য় দিন—ফজরের সময় আমি নামাজ পড়ে অজিফা পড়ে দোয়া করলাম।
আমার মন খারাপ, জিবরীলের অবস্থা উন্নতি হচ্ছে না। সূর্যোদয় দেখে আমার মনে হলো, ইনশা আল্লাহ, ভালো সময় আসবে। হাসপাতালের অনলাইনে জিবরীলের জন্য ভেজিটেরিয়ান খাবার অর্ডার করলাম।
খুব একটা অবস্থা উন্নতি হচ্ছে না, দোয়া আর সেবায় কাটছে আমার ক্ষণ।
দুপুর বেলায় আমার শাশুড়ি, দেবর দেখতে এল। জিবরীলকে দেখে ভীষণ মন খারাপ হলো, আমাকে দেখে ও বুঝতে পারছিল, আমি ভীষণ ক্লান্ত। জিবরীলের জন্য সদগা দেওয়া হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পর নার্স এল কিছু বই নিয়ে। জিবরীলকে বলল বই পড়ো, টিভি দেখো, কিছু লাগলে আমাদের জানিও। এই রুমের টিভিটা কাজ করছে না।
চতুর্থ দিন—রাতে বা দিনে জিবরীল ২-৩ ঘণ্টা টানা ঘুমাতে পারে না। কিছুক্ষণ পর পর এসে ওষুধ দেয়। ওর সঙ্গে সঙ্গে আমিও জেগে থাকি। আর সারা দিন তো সব কিছু করা লাগে।
আজ সকাল থেকে অস্থির লাগছে। শান্তভাবে জানালার দিকে তাকাতে চোখে পড়ল সাসকাচুয়ান রিভার, ভীষণ শান্ত আর বহমান। নিজেকে বললাম, অস্থির হওয়া যাবে না নদীর মতো হতে হবে। নদীর সঙ্গে মিতালি করেছে বিশাল নীল আকাশ। নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ব্রিজে ট্রেন যাচ্ছে, আরেক পাশে প্রমোদতরি, নাম তার ওয়াটার লিলি অপেক্ষায়, গ্রীষ্ম এলেই হবে উৎসব। জানালা থেকে শহরের এই দৃশ্য ভীষণ মনোরম। সারা দিনের ভীষণ ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তায় জানালার এই ভিউ টাই আমার একমাত্র প্রশান্তি।
দুপুরের দিকে নার্স কিছু খেলনা এনে জিবরীলকে দিল, জানালো স্পাইডার ম্যান আসছে বাচ্চাদের আনন্দ দিতে। কিছুক্ষণ পর স্পাইডার ম্যান এল বেলুন নিয়ে। বাচ্চাদের জন্য আজ শুভ দিন। স্পাইডার ম্যানকে পেয়ে বাচ্চাদের মধ্যে হইচই পড়ে গেছে ।
জিবরীল কিছুটা ভালো বোধ করছে। বিকেল শরীফ ভাই আর ভাবি এল আমাদের জন্য খাবার নিয়ে এল।
সালেহীন ভাই, সিনথি ভাবীও এল সঙ্গে মিশান। ওনারা ও খাবার নিয়ে এলেন।
পঞ্চম দিন—জিবরীল অনেকটা ভালো বোধ করছে। মাঝেমধ্যে অক্সিজেন লেভেল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, এটা আমাদের সবাইকে ভাবাচ্ছে। আজ ৫ দিন সকাল বিকেল দুই বেলা ব্লাড ওয়ার্ক, স্যালাইন, প্রতি ঘণ্টায় ওষুধ সব মিলিয়ে সে কিছুটা খিটখিটে হয়ে গেছে।
সিনথি ভাবী আজ ও খাবার নিয়ে এল, বলল, আপনি বাসায় গিয়ে ১ ঘণ্টা রেস্ট নিন। আমি ভাবিকে হসপিটালে রেখে বাসায় এসে দ্রুত কিছু কাজ করলাম, তা–ও প্রায় ২ ঘণ্টা লেগে গেল। দ্রুত হসপিটালে ফিরে গিয়ে ভাবিকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাসায় পাঠালাম।
ষষ্ঠ দিন—জিবরীলের আজকে সব কিছু নরমাল। ডাক্তার এসে জানাল দুপুর পর্যন্ত ওরা দেখবে। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে জিবরীলকে রিলিজ দেবে।
আমি প্রার্থনা করছিম ওর সুস্থতার জন্য।
দুপুরে ডাক্তার এল, খুব ভালো করে জিবরীলকে মনিটর করল, সব কটি রিপোর্ট রিচেক করল।
আমাকে বলল, ওর মেডিসিনের ডোজ বদলে দিয়েছে, আগের থেকে আরেক টু বেশি। আর কিছু ট্রেনিং দিল জিবরীলকে। আমাকে বলল, আজ বিকেলে বাসায় ফিরতে। কিন্তু কাল ওকে স্কুলে দিতে না করল। আরও কিছুদিন ওর বিশ্রাম প্রয়োজন। এবারের অ্যাজমা অ্যাট্রাকটা ম্যাসিভ ছিল।
আলহামদুলিল্লাহ, আমি একটু স্বস্তির নিশ্বাস নিলাম। তার মানে জিবরীল অনেকটাই সুস্থ। অবশেষে জিবরীল বাসায় যাবে। ছেলেটা একটু নিজের মতো থাকতে পারবে।
যা–ই হোক সব নিয়মকানুন শেষ করে বাসায় যেতে পড়ন্ত বিকেল।
জিবরীল হেঁটে লিফটে যেতে চাইছে না, সে খুব দুর্বল। সে হুইলচেয়ারের জন্য রিকুয়েস্ট করতে বলছে। আমি ওকে বুঝিয়ে আমার হাতে ওর হাত রেখে লিফটের কাছে নিয়ে গেলাম।
পার্কিং লটে এলে গাড়িতে উঠে হাত নাড়িয়ে হাসপাতালকে বিদায় জানালাম, এ এক আনন্দের বাড়ি ফেরা। ছোট্ট জিবরীল সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরছে। আলহামদুলিল্লাহ!
লেখক: তামান্না মহুয়া, প্রোগ্রাম এক্সেস কো–অর্ডিনেটর, সাস্কাচুয়ান হেলথ রিজিওন, সাস্কাটুন, কানাডা
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com