এ সপ্তাহের সোশ্যাল মিডিয়া কাঁপানো ব্যক্তি আর কেউ নন, ফেঞ্চুগঞ্জের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পাল। তাঁর একটি রিলকে কেন্দ্র করে মিডিয়ায় যেন ঝড় উঠেছে। ২৩ জুলাই ছুটির পর বিদ্যালয় চত্বরে হাঁটতে হাঁটতে তিনি একটি ছোট ভিডিও ধারণ করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট করেন। ভিডিওর সঙ্গে ব্যবহার করেন ডিফারেন্ট টাচ ব্যান্ডের ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানের একটি অংশ।
সব মানুষ তো আর শয়তান নয়, সন্তও নয়। মানুষ আনন্দ করে, আবৃত্তি, নাটক, গান করে, নাচে। এটা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তারা এটা করে আনন্দ পায়। তবে এর মধ্যেও অনেক সময় শয়তান ঢুকে পড়ে। তারা কারণে–অকারণে হামলে পড়ে, নিজের কুৎসিত মন দিয়ে একটা সুন্দর জিনিসকেও অসুন্দর বানিয়ে ফেলে। তাদের সেই শিক্ষা কিংবা রুচিবোধ নেই। ব্যাপারটা কি আমাদের জিনগত? মনে রাখতে হবে, আমরা উঠে এসেছি একটি অন্ত্যজ শ্রেণি থেকে। আমরা ছিলাম নিতান্তই প্রাকৃতজন।
বিউটি পালের ভিডিওটি পরে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ‘নেতিবাচক তথ্য যুক্ত করে’ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর জেরে তাঁকে নিয়ে শুরু হয় ট্রল, অনুদার মন্তব্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণ। কেউ কেউ সরকারি কর্মচারীর আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান।
তবে সমাজটা এখনো পুরোপুরি উচ্ছন্নে যায়নি। বিউটি পালের সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়ার এ ঘটনা যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন দেশের অনেক নারী শিক্ষক একই গানের সঙ্গে নিজেদের ছবি ও ভিডিও জুড়ে দিয়ে ফেসবুকে দিতে থাকেন। শুরু হয় অভিনব এক প্রতিবাদ। তাঁদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে দেশ-বিদেশের নানা শ্রেণি-পেশার নারী ও পুরুষ একই গানের ভিডিও ফেসবুকে দিতে থাকেন। কেউ কেউ ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখেও বিউটি পালের পক্ষে অবস্থান নেন। আমরা দেখতে পেলাম সংহতি জানানোর এক অভিনব উদাহরণ।
সৃষ্টির শুরু থেকেই আমরা দেখে আসছি সুন্দরের সঙ্গে অসুন্দরের লড়াই, সুর আর অসুরের দ্বন্দ্ব। কার পাল্লা কতটুকু ভারী, সেটা দিয়ে বোঝা যায় একটা সমাজ কোন পর্যায়ে আছে। বিউটি পালের ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে যা হলো, সেটি একটি বার্তা দেয়।
এখানে একটি প্রশ্ন জাগে, যিনি সিনেমা দেখতে চান না, তাঁকে কি সিনেমা দেখতে জোর করা হয়েছে? তা তো হয়নি! তাহলে যাঁরা সিনেমা দেখতে চান, তাঁরা কেন সেখানে বাধা দেন? আমরা দেখলাম, রাষ্ট্র এখানে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে।
আমাদের সমাজ একটা নয়; এখানে অনেক ভাগ। একদল লোক যা চান, অন্য দলের লোকেরা চান বিপরীত। এটা তেমন সমস্যা নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন একদল লোক তাঁদের মত অন্যের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিতে চান। এই জবরদস্তি জিনিসটা ভালো নয়। এখানেই আমরা ধরা খেয়ে যাই। এসব করতে করতে আমরা সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে একটা ‘অসভ্য’ জাতি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরছি। দেশের বাইরে আমাদের দরজা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। আমরা ঢোল পিটিয়ে আমাদের নেতাদের যতই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সন্তান কিংবা বিশ্বরত্ন হিসেবে প্রচার করি না কেন, আমাদের পাসপোর্টের মান ক্রমে নিম্নগামী। তাহলে কি বলব যে আমরাই ঠিক আছি, আর সারা দুনিয়া ভুল করছে?
কিছুদিন আগে একটি জেলা শহরে একটি সিনেমা দেখানো নিয়ে গোলমাল হয়েছে। সিনেমাটি শেষমেশ প্রদর্শিত হয়নি। ওই শহরে একটি গোষ্ঠী আছে, যারা মনে করে, সিনেমা দেখা অন্যায় কাজ।

এ দেশে অনেকেই বিশ্বাস করেন এবং মেনেও চলেন যে নারী তাঁর স্বামীর অনুমতি ছাড়া ঘরের চৌকাঠ মাড়াবেন না। একবার এক হুজুর কী একটা ফতোয়া দিলেন। মাদ্রাসার ছেলেপুলেরা দলে দলে বেরিয়ে মহানন্দে রাস্তার দুপাশে ব্র্যাক, প্রশিকা আর গ্রামীণ ব্যাংকের নারী সদস্যদের লাগানো হাজার হাজার গাছ উপড়ে ফেলল। আরেকবার সেখানে তুলকালাম হয়েছিল। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর নামে পরিচালিত একটি গান শেখার স্কুল পুড়িয়ে দিয়েছিল। রাষ্ট্র কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কারণ, রাষ্ট্রের মালিকেরা নিম্নমানের জনতুষ্টির রাজনীতি করেন।
মনে আছে, ‘মুসলমানের ভোটব্যাংক’ পাওয়ার আশায় এ দেশে সেক্যুলার রাজনীতির লাইসেন্সধারী আওয়ামী লীগ ২০০৬ সালে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে পাঁচ দফা চুক্তি করেছিল, যার একটি দফায় ‘আলেমদের ফতোয়া দেওয়ার অধিকার’ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ক্ষমতার জন্য মানুষ কত–কী না করে!
এখানে একটি প্রশ্ন জাগে, যিনি সিনেমা দেখতে চান না, তাঁকে কি সিনেমা দেখতে জোর করা হয়েছে? তা তো হয়নি! তাহলে যাঁরা সিনেমা দেখতে চান, তাঁরা কেন সেখানে বাধা দেন? আমরা দেখলাম, রাষ্ট্র এখানে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। সমাজপতিরা তেমন প্রতিবাদ করলেন না। শুধু ওই জেলার একজন নির্দল সংসদ সদস্য সাহস করে একটি প্রতিবাদ সভায় কথা বলেছেন, তা-ও জেলা শহরে নয়, নিজের সংসদীয় এলাকায়। হয়তো আশঙ্কা ছিল, রাষ্ট্র তাঁকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীতশিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এ নিয়ে সমাজের একটি অংশ সমালোচনামুখর হয়ে ওঠে। তারা মনে করে, গানবাজনা হারাম। তাদের কেউ কেউ সংগীতশিক্ষকের বদলে ধর্মশিক্ষক নিয়োগের দাবি তুলেছে। অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই পিঠটান দিয়েছে, নাকি আগের সিদ্ধান্তকে ‘কুফরি’ মনে করে সরে এসেছে, তা বলা মুশকিল। ওই সরকারের কোনো কোনো মুখপাত্র হররোজ সাংবাদিক দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়তেন আর কথার তুবড়ি ছোটাতেন। স্কুলে সংগীতশিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত ব্যাপারে তাঁদের কথা বলতে দেখলাম না। মনে হলো তাঁরা চুপসে গেছেন।
পাকিস্তান আমলে একটা কথা প্রায়ই শোনা যেত—ইসলাম বিপন্ন। এ নিয়ে তারা রাজনীতির তেজারতি করেছে ২৩ বছর। এ প্রসঙ্গে আরেকটি উদাহরণ দিই।
১৯৫৪ সালে প্রদেশে সাধারণ নির্বাচন হবে। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের লোকদের মুখে একটাই কথা—মুসলিম লীগের বিরোধিতা মানে ইসলামবিরোধিতা। কথায় কথায় তারা বলত, ইসলাম গেল, ইসলাম ডোবে। যুক্তফ্রন্টের নেতা শেরেবাংলা নামে খ্যাত এ কে ফজলুল হক সারা দেশ চষে বেড়াচ্ছেন, জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেন, সবাইকে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীদের ভোট দিতে অনুরোধ করছেন। ১৯৫৩ সালের ১৩ নভেম্বর চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে তাঁর অনুরোধে কেএসপি নেতা বি ডি হাবীবুল্লাহ মঞ্চে ভাষণ দিতে গিয়ে মুসলিম লীগের অপপ্রচারের জবাবে একটি গল্প বলেন:
ইসলাম মোড়ল নদীতে পড়ে গিয়ে চিৎকার করতে লাগল—ইসলাম ডোবে, ইসলাম ডোবে। লোকজন তাকে পাড়ে তুলে বলল, তোমার কাছে কোরআন-কেতাব আছে নাকি? নতুবা তোমার সঙ্গে ইসলাম ডোবে কী করে? লোকটা বলল, আমার নামই ইসলাম। এ গল্পে জনতা বুঝে গেল কেন মুসলিম লীগ ‘ইসলাম ডুবল’ বলে চিৎকার শুরু করেছে।
আমাদের দেশে একধরনের প্রবণতার দেখা পাই। একশ্রেণির মানুষ আছে, যারা সব সময় মুখে ধর্মের কথা কথা বলে, কিন্তু কাজ করে অধর্মের। সাম্প্রতিক কালে তারা একটা মবতন্ত্র নিয়ে হাজির হয়েছে। এরা ধর্মবিরোধী বলে যাকে খুশি ট্যাগ লাগিয়ে হেনস্তা করে। এসব লোকের সংখ্যা দেশে মনে হয় বাড়ছে। আর তাদের পালে হাওয়া দিচ্ছে একদল দিগ্ভ্রান্ত বুদ্ধিজীবী ও মতলববাজ রাজনীতিবিদ। তাদের একটাই মিশন—ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করা। আমাদের মূলধারার গণমাধ্যম মনে হয় ভয়ে চুপসে আছে। এ নিয়ে আলোচনা খুব কম।
-
মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব