‘… হলুদ গোলাপ তোমার আরোগ্যের আর লাল গোলাপ তোমার আকাঙ্ক্ষার জন্য। কার্ডটি আমার পছন্দের, তাই পাঠালাম। আশা করি তোমারও পছন্দ হবে…!’
বাদামি রঙের মাঝারি আকারের প্যাকেটে ডাকে আসা জিনিসগুলো বিছানায় ছড়িয়ে আছে। হলুদ কাগজে ছোট্ট নোটটা পড়ে দীপন। মনে হচ্ছে, মাথার যন্ত্রণাটা দ্রুত কমে আসছে।
তার আগে সকালে ক্লিনিকে যেতে হলো তাকে। আজ মাথার ব্যান্ডেজ খুলে পরিষ্কার করার তারিখ। ওখানে গিয়ে লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হলো। ‘অপেক্ষা’ বিষয়টা ওর কাছে বড়ই বিরক্তিকর। আজও গত দিনের নাইজেরিয়ান সেই মোটা মহিলা ক্লারা। দরজা খুলে মুচকি হেসে দীপনকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ভেতরে নিয়ে যান। ক্লারার পরামর্শ মোতাবেক টুপি, জ্যাকেট খুলে রোগীদের জন্য পাতা খালি বিছানায় গা ছেড়ে দেয় দীপন। ক্লারা কাঁচি দিয়ে মাথার ব্যান্ডেজ আস্তে আস্তে খুলে নেন।
—কী অবস্থা এখন মিস্টার দীপন তোমার?
ভাঙা ইংরেজিতে প্রশ্ন করেন।
—হ্যাঁ, ব্যথা আগের চেয়ে কম মনে হচ্ছে।
—ঠিক তা–ই। যতই ক্ষত শুকাবে, ব্যথা ততই কমবে।
—আরও কি আসতে হবে আমাকে?
—হবে। এটা নির্ভর করছে তোমার মাথার ক্ষত শুকানোর অগ্রগতির ওপর।
ক্লারা ততক্ষণে মাথায় ক্লিনিং-লিকুইড ঢেলে ক্ষত ধুয়ে নেন সযত্নে।
—তোমাকে এই লিকুইড নিজের পয়সা দিয়ে কিনে আগামীবার আনতে হবে। আমাদের এখানে এটা আর নেই।
সযত্নে মাথায় হাত রেখে বলেন, ‘আর শোনো। সাথে ঠিক এ ধরনের এক প্যাকেড “গজ” নিয়ে এসো কেমন?’ ক্ষতের ওপর মলমজাতীয় ওষুধের প্রলেপ দিয়ে ঠিক আগের মতো গজ পেঁচিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেন ক্লারা।
—শাওয়ার করা যাবে, কিন্তু আপাতত মাথা ভেজাবে না, কেমন?
—অবশ্যই।
—অ্যান্টিবায়টিক ওষুধটা খেয়ো ঠিকমতো। আর বেশি ব্যথা হলে পেইনকিলার ট্যাবলেট। এ–ই যথেষ্ট।
ক্লারাকে লম্বা একটা ধন্যবাদ জানিয়ে রাস্তায় নেমে আসে দীপন। আজ বাইরের আবহাওয়া খারাপ নয়। ঝলমলে রোদ আছে। পেছনে সাবওয়ে-ব্রিজের ওপর দিয়ে শাঁ শাঁ শব্দ তুলে একটা ট্রেন চলে গেল। সে কি বাসে যাবে? বাস ধরতে হলে বড় রাস্তায় উঠে সামনে অথবা পেছনে অনেকটা পথ হাঁটতে হবে। ইচ্ছে করলে সময় নিয়ে সামনের পুরোটা পথই হেঁটে ঘরে যাওয়া যায়। ভালোই লাগবে। তেমন কোনো তাড়া নেই এখন।
সাংগীতিক মূর্ছনায় জ্যাকেটের পকেটে মোবাইল ফোন বেজে ওঠে।
—হ্যালো! দীপন ভাই। আমি রওশন।
বাংলাদেশ থেকে কলেজবন্ধু ও কবি রওশনের ফোন। সে ঢাকার একটি জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য বিভাগে আছে। ভালোই করছে রওশন!
—রওশন ভাই, আপনি কি আমার লেখাটা পেয়েছেন?
—পেয়েছি। অনেক ধন্যবাদ। শোনেন। আপনার একটা ছবি পাঠাতে হবে। এ জন্যই ফোন দিলাম। প্লিজ! আপনার ওখানকার বাঙালি–অধ্যুষিত এলাকায় তোলা আপনার একটা ছবি।
—কিন্তু ভাই, পত্রিকায় ছাপানোর মতো আমার তো তেমন কোনো ছবি নেই! একটি দুর্ঘটনার পর বেশ কদিন হলো ঘরে পড়ে রয়েছি। আর এই অবসরেই একটা লেখা তৈরি করে পাঠালাম।
—দুর্ঘটনা!
—হ্যাঁ ভাই। এ দুর্ভাগা যেখানে যায়, সেখানেই অঘটন ঘটে যায়। হা! হা! হা!
—কীভাবে?
—রাতে কাজ থেকে মোটরবাইকে বাসায় যাচ্ছিলাম। মাঝপথে ট্রাফিক সিগন্যালে হঠাৎ দুইটা মোটরবাইক আমার পথ আটকে দেয়। জায়গাটি মোটামুটি নির্জন। তাকিয়ে দেখি হেলমেট পরা চারজন মানুষ। দুজন নেমে আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। মোটরবাইক থেকে আমাকে টেনেহিঁচড়ে রাস্তায় ফেলে দেয়। নতুন কেনা আমার সখের বাইকটা আর পকেট হাতিয়ে টাকাপয়সা ছিনিয়ে নেয়। কী ভেবে মোবাইল ফোনটা নেয়নি ওরা। একজন শক্ত লাঠি দিয়ে আমার মাথায়, পিঠে আঘাত করে। আমি অচেতন হয়ে পড়ি। জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় আবিষ্কার করি। পরদিন মাথায় অপারেশন হলো। মাথায় বেশ কয়েকটা সেলাই পড়েছে। পরদিন রিলিজ হলো। এখন মাথার ও পিঠের আঘাত নিয়ে এক মাস ধরে রেস্টে আছি। পুরো সেরে উঠতে আরও কিছুদিন লাগবে। ভাই, সৃষ্টিকর্তা বাঁচিয়েছেন।
—বিলেতেও ছিনতাইকারী? বলেন কী!
—এরা কোথায় নেই?
—যাহোক ভাই। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন। প্লিজ, আপনার ছবিটা আগামী দুই দিনের মধ্যে আমার ই–মেইলে পাঠিয়ে দেবেন। আপনার লেখাটি আগামী সংখ্যায় ছাপা হচ্ছে। যতই বিদেশ করেন, আসল ঠিকানা তো বাংলাদেশ!
—ঠিকই বলেছেন রওশন ভাই।
—হ্যাঁ দীপন ভাই। আমি বুঝি। প্রবাসী বাঙালিদের হৃদয়ে থাকে লাল-সবুজের ঠিকানা। মননে থাকে একটি মানচিত্র, বাংলাদেশ! আর দেশের মানুষ। তো, ভালো থাকুন ভাই!
দীপনের মনে হচ্ছে, এখন তার মাথায় একটা ভারী বোঝা চেপে বসেছে। লেখা ছাপা হবে, ভালো কথা। তার সাথে আবার ছবি কেন? মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা লেখকের ছবি! পাঠকদের চোখ যে কপালে উঠে যাবে!
মোবাইলের রিংটোন আবার! ‘হ্যালো’ বলতেই ওপাশ থেকে সেই মোলায়েম নারী কণ্ঠ—হ্যালো! এখন কেমন? আজ ব্যান্ডেজ চেঞ্জ করতে গিয়েছিলে?
—জি ম্যাডাম। ওখান থেকেই অধম আমি এখন পদব্রজে ঘরে ফিরছি।
—ডক্টর কী বলল?
—তাড়াতাড়ি সেরে যাবে।
—এখনো কি ব্যথা…
—আছে। মনে হয় ওটা সহজে আমাকে ছাড়বে না।
—কেন ছাড়বে না?
—কেন ছাড়বে না, তা–ও কি জানেন না? আমার এ ব্যথা যে হৃদয় টু হৃদয় সংযুক্ত তাই।
—তাই বুঝি? তাহলে তো সেরেছে!
—না। সারছেই না। যতক্ষণ না একটা রবীন্দ্রসংগীত হচ্ছে…প্লিজ!
—তা হচ্ছেই না। এবার সাস্কাচুয়ানে অনেক স্নো পড়েছে। তো ম্যানচেস্টারের কী অবস্থা?
—হ্যাঁ, পড়েছে। আপনার দেশের চেয়েও অনেক বেশি! তো ওই যে কী যেন বললেন, হচ্ছেই না…!
—বলেছি, আজ আমার গলা ভালো নেই…গলা বসে আছে একদম।
—কেন? গলায় কি আপনার কোনো দুর্ঘটনা? কোনো ব্যথা?
সে সুর করে গায়, ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী…’
—বাহ্! ভালোই তো গেয়েছেন! আমি আজ গাইতে পারছি না! ঠান্ডা লেগেছে। খুসখুসে কাশি।
—তা হোক। তারপরও আপনার, না না, তোমার কণ্ঠের গান শুনতে ভালোবাসি! তার আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও, ‘কায়াবিহীন ছায়া’ হয়ে আর কত খেলে যাবে আমার সাথে?
মোবাইলের ওপাশ থেকে ‘এই করেছ ভালো, নিঠুর হে এই করেছ ভালো…’ ভরাট কণ্ঠ দিঘল আবহে দীপনের দেহ-মনে শিহরণ জাগায়।
—আচ্ছা! আজ এ পর্যন্তই। সাবধানে পথে চলাফেরা কোরো। তাড়াতাড়ি সুস্থ হও—এই শুভ কামনা রইল।
দীপন কিছু বলার আগেই মোবাইলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নাহ্, তার প্রশ্নের উত্তর আজও পায়নি সে!
অনেকটা পথ পায়ে হেঁটে বাসায় আসে দীপন। দরজার কাছে পোস্ট-বক্সটা খুলতেই বাদামি প্যাকেটটা পায় সে। ঘরে ঢুকেই ব্যস্ত হয়ে প্যাকেটটা খোলে। এবার অবাক হওয়ার পালা! ‘কী দুষ্টুরে বাবা! সে একটা মেইল পাঠাল। অথচ একবারও বলল না!’
তাই দীপনের এবার রিং করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোবাইলে ওর নম্বরটিতে সংযোগ দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই! বারবারই ভয়েস-মেইলে চলে যাচ্ছে। মোবাইল চালু রেখে দীপন বলে যায়, ‘তোমার পাঠানো মেইলটি এই মাত্র পেয়ে আমি তো সারপ্রাইজড! এখন মনে হচ্ছে, পুরোপুরি সুস্থ হয়েই উঠেছি। থ্যাংকস!’
‘তুমি রবে নীরবে, অন্তরে মম…’ গাইতে গাইতে অন্য জগতে চলে যায় দীপন।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com