সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / এক রাতেই ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ৪ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী খুন! পর্দায় ভয়ংকর সেই গল্প
এক রাতেই ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ৪ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী খুন! পর্দায় ভয়ংকর সেই গল্প

এক রাতেই ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ৪ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী খুন! পর্দায় ভয়ংকর সেই গল্প

নভেম্বরের এক শীতল রাত। যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহো অঙ্গরাজ্যের ছোট্ট বিশ্ববিদ্যালয় শহর মস্কো তখন ঘুমিয়ে। সপ্তাহান্তের আনন্দ শেষে কেউ ফিরেছেন পার্টি থেকে, কেউ ঘুমিয়ে পড়েছেন পরদিনের ক্লাসের কথা ভেবে। কিন্তু সেই রাতেই চারটি পরিবারের জীবনে নেমে আসে এমন এক অন্ধকার, যার শেষ আজও মেলেনি।

২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর ভোররাতে ইউনিভার্সিটি অব আইডাহোর কাছের একটি ভাড়া বাড়িতে নৃশংসভাবে খুন হন চার শিক্ষার্থী—ইথান চ্যাপিন, কেলি গনকালভেস, জ্যানা কার্নোডল ও ম্যাডিসন মোগেন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মুহূর্তেই থেমে যায় তাঁদের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ আর তারুণ্যের গল্প।

হত্যাকাণ্ডটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই নয়, পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। কারণ, এটি ছিল এমন এক অপরাধ, যার কোনো স্পষ্ট কারণ খুঁজে পাচ্ছিলেন না তদন্তকারীরা। কে এই হত্যাকারী? কেন তিনি চার তরুণ-তরুণীকে বেছে নিলেন? কী ছিল তাঁর উদ্দেশ্য?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই নির্মিত হয়েছে নেটফ্লিক্সের তিন পর্বের তথ্যচিত্র ‘দ্য আইডাহো মার্ডারস: কলেজ নাইটমেয়ার’। ২৯ জুলাই মুক্তি পাওয়া এ তথ্যচিত্র নতুন করে সামনে এনেছে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি।

ডিএনএর একটি ক্ষুদ্র সূত্র
ঘটনার পরপরই পুলিশ বুঝতে পারে, এটি সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই, খুনির পরিচয় নেই, নেই স্পষ্ট উদ্দেশ্যও। তদন্তের মোড় ঘুরে যায় ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা একটি ছুরির খাপ থেকে। সেখানে পাওয়া যায় একটি ডিএনএ নমুনা। সেই নমুনা বিশ্লেষণ করেই তদন্তকারীরা পৌঁছে যান ব্রায়ান কোহবার্গারের কাছে।

শুধু ডিএনএ নয়, পুলিশের হাতে আসে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ঘটনাস্থলের আশপাশে দেখা যায় একটি সাদা গাড়ি। নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে গাড়িটির চলাচল ধরা পড়ে। পাশাপাশি মুঠোফোনের অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, হত্যাকাণ্ডের সময় কোহবার্গারের ফোন হঠাৎ নেটওয়ার্কের বাইরে চলে গিয়েছিল। এসব তথ্য একত্র করে তদন্তকারীরা তাঁকে গ্রেপ্তার করেন।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে আদালতে দোষ স্বীকার করেন কোহবার্গার। এরপর তাঁকে চারটি হত্যার দায়ে প্যারোলের সুযোগ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

কিন্তু ‘কেন’
মামলার বিচার শেষ হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর আজও অজানা। কেন এই চারজন? কেন ওই বাড়ি?
কেন এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড? কারণ, কোহবার্গার বিচার শুরুর আগেই দোষ স্বীকার করেন। ফলে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় তাঁর উদ্দেশ্য বা মানসিক অবস্থার বিশদ বিশ্লেষণের সুযোগ আর হয়নি।

‘দ্য আইডাহো মার্ডারস: কলেজ নাইটমেয়ার’–এর পোস্টার। আইএমডিবি

তথ্যচিত্রে মস্কো পুলিশের প্রধান অ্যান্থনি ডালিঙ্গার অকপটে স্বীকার করেন, তদন্তে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিললেও ‘কেন’—এ প্রশ্নের উত্তর তাঁরা কখনোই পাননি। তাঁর ভাষায়, ‘হয়তো এ প্রশ্নের উত্তর আর কোনো দিন জানা যাবে না।’

অপরাধবিদ্যার ছাত্র, নাকি অপরাধের পরিকল্পনাকারী
ব্রায়ান কোহবার্গারের পরিচয়ও মানুষকে বিস্মিত করেছিল। তিনি ছিলেন অপরাধবিদ্যার শিক্ষার্থী। ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ক্রিমিনোলজি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। তার আগে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তরও করেছেন।

তথ্যচিত্রে কোহবার্গারের সাবেক সহপাঠী লিলি কারাবান বলেন, সিরিয়াল কিলার নিয়ে ক্লাসে কোহবার্গার সব সময় আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে চাইতেন। দলীয় আলোচনায় অন্যদের মতামতের খুব একটা গুরুত্ব দিতেন না। ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন একাকী।
তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও জোরালো হয়, যখন তাঁরা দেখতে পান, গবেষণার অংশ হিসেবে দাবি করে কোহবার্গার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডিটে একটি প্রশ্নাবলি প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে তিনি কারাবন্দীদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, অপরাধ করার সময় তাঁরা কী ভাবতেন, কীভাবে ভুক্তভোগী নির্বাচন করতেন এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেন।

তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়া কয়েকজনের ধারণা, অপরাধবিদ্যার প্রতি তাঁর আগ্রহ হয়তো কেবল একাডেমিক ছিল না; বরং তিনি ‘নিখুঁত অপরাধ’ সম্পর্কে একধরনের বিকৃত কৌতূহল পোষণ করতেন। অবশ্য এ ধরনের ধারণার পক্ষে আদালতে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি।

নারীদের প্রতি ঘৃণা?
তথ্যচিত্রে আরও উঠে এসেছে কোহবার্গারের আচরণ নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী তদন্তকারীদের জানান, তাঁর আচরণে তাঁরা অস্বস্তি বোধ করতেন। একজন অভিযোগ করেন, কোহবার্গার একবার তাঁকে গাড়ি পর্যন্ত অনুসরণ করেছিলেন এবং আক্রমণাত্মকভাবে কথা বলেছিলেন।

সহপাঠী লিলি কারাবানের বিশ্বাস, নারীদের প্রতি তাঁর গভীর ক্ষোভ ছিল। তাঁর মতে, তিন নারী ভুক্তভোগীর ওপর যে নির্মমতা চালানো হয়েছে, তা সেই মানসিকতারই প্রতিফলন হতে পারে। তবে এই মূল্যায়ন সাক্ষাৎকারদাতাদের ব্যক্তিগত মতামত। হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য নিয়ে আদালত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি।

আদালতের রায়, কিন্তু শেষ হয়নি শোক
বিচার শেষ হলেও নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য যন্ত্রণা শেষ হয়নি। অনেকেই চেয়েছিলেন মামলাটি পূর্ণাঙ্গ বিচারের মধ্য দিয়ে যাক। তাঁদের আশা ছিল, আদালতে অন্তত জানা যাবে কেন তাঁদের সন্তানদের হত্যা করা হয়েছে।
কেলি গনকালভেসের বাবা স্টিভ গনকালভেসের মতে, মৃত্যুদণ্ড না হওয়ায় কোহবার্গার অনেকটাই রেহাই পেয়ে গেছেন। তাঁর মেয়ে আলিভিয়াও একই হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বিশ্বাস, এমন অপরাধীর কোনো ধরনের আইনি সুবিধা পাওয়া উচিত ছিল না।

অন্যদিকে জ্যানা কার্নোডলের বোন জ্যাজমিন বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখেন। তাঁর মতে, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া পুরো পরিবারকে আবারও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করত। সমঝোতার মাধ্যমে মামলার নিষ্পত্তি হওয়ায় অন্তত তাঁরা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন।

কারাগার থেকেই নতুন দাবি
মামলার রায়ের এক বছর পর আবারও আলোচনায় আসেন ব্রায়ান কোহবার্গার। ২০২৬ সালে কারাগার থেকে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, তিনি নির্দোষ। তাঁর ভাষায়, দোষ স্বীকারের প্রক্রিয়ায় অনেক ভুল হয়েছে এবং তিনি চান আদালত আবার বিষয়টি বিবেচনা করুন।
কোহবার্গার ইতিমধ্যে নিজের দণ্ডের বিরুদ্ধে আবেদনও করেছেন। তবে আদালতের রায় এখনো বহাল রয়েছে এবং তিনি সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন।

উত্তরহীন প্রশ্নের গল্প
সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত অনেক তথ্যচিত্রই অপরাধীর পরিচয় জানিয়ে শেষ হয়। কিন্তু ‘দ্য আইডাহো মার্ডারস: কলেজ নাইটমেয়ার’ অন্য রকম। এখানে খুনি কে, তা দর্শক জানেন। জানা আছে, কীভাবে পুলিশ তাঁকে ধরেছে। আদালতের রায়ও হয়েছে। তবু একটি প্রশ্নের উত্তর মেলে না—কেন?
এই ‘কেন’-এর উত্তরহীনতাই তথ্যচিত্রটিকে শুধু একটি অপরাধের পুনর্নির্মাণ নয়; বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব, শোক, বিচারব্যবস্থা এবং হারিয়ে যাওয়া চার তরুণ জীবনের অসমাপ্ত গল্পে পরিণত করেছে।

টাইম অবলম্বনে

About Editor Todaynews24

Check Also

পেরুতে পর্যটকবাহী উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত, ১৩ আরোহীর সবাই নিহত

দুর্ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল বেলা ১টার কিছু পর, রাজধানী লিমা থেকে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে পিসকো শহরে। সেখানকার বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পরপর উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *