উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে নদীভাঙন এক চিরচেনা অভিশাপের নাম। বর্ষার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় ভাঙনের যে বিভীষিকা শুরু হয়, তা রূপ নেয় হাজারো মানুষের নিঃস্ব হওয়ার করুণ মহাকাব্যে। সম্প্রতি রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তার তীব্র স্রোতে একের পর এক বসতভিটা বিলীন হওয়া কিংবা কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রের ডান তীর রক্ষা বাঁধের ধস—একই দুঃখজনক চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। জীবনভর কষ্ট করে গড়ে তোলা শেষ সম্বলটুকু যখন নদীর পেটে চলে যায়, তখন ভুক্তভোগী মানুষের আহাজারি কেবল একটি সংবাদ হয়ে থাকে; কিন্তু পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আমলাতান্ত্রিক নিস্পৃহতায় তার কোনো স্থায়ী সমাধান মেলে না।
ভাঙন দেখা দিলে কয়েক শ জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িক ‘জরুরি কাজ’ দেখানোর যে প্রথা দেশে চালু আছে, তা যে একেবারেই অকার্যকর—চিলমারীর ঘটনাটি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। ২০১৬ সালে ৪৪৮ কোটি টাকা খরচ করে চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রের যে ডান তীর রক্ষা বাঁধ তৈরি করা হয়েছিল, ২০১৮ সাল থেকেই তাতে ধস নামছে। চারবার ধসের পর যেখানে হাজার হাজার মানুষের ভিটেমাটি আর ফসলি জমি হুমকিতে, সেখানে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বালুর বস্তা ফেলতে রাজপথে নামতে হয়—এ বাস্তবতা পাউবোর নজরদারি ও চরম অব্যবস্থাকেই কি ফুটিয়ে তোলে না? ৪৪৮ কোটি টাকার বাঁধ নির্মাণের পরও যদি স্থানীয় মানুষের হাজার হাজার জিও ব্যাগ কিংবা টি-বাঁধের আকুতি জানাতে হয়, তবে সেই মেগা প্রকল্পের গুণগত মান ও স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
একইভাবে গঙ্গাচড়ার নোহালী ইউনিয়নে নদী যখন বসতভিটা ও ভিটেমাটি গিলে খাচ্ছে, তখন স্থানীয় প্রশাসনের আশ্বাস কেবল ‘শুকনা খাবার’ দেওয়া আর ‘তালিকা তৈরি’ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চাল কিংবা চাল-ডালের ত্রাণ দিয়ে হয়তো কয়েক দিনের ক্ষুধা মেটানো যায়, কিন্তু গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই রক্ষা করা যায় না। নদীর প্রবাহ পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থায়ী নদীশাসন বা টি-বাঁধ নির্মাণের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত প্রকল্প বছরের পর বছর ‘অনুমোদনের অপেক্ষায়’ ঝুলে থাকে। আর সেই সুযোগে ঠিকাদারি ও জিও ব্যাগ ফেলার সাময়িক ব্যবসায় কোটি কোটি টাকার বাজেট খরচ হলেও দিন শেষে সাধারণ মানুষই সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়।
জোড়াতালির সাময়িক পদক্ষেপ বন্ধ করে কুড়িগ্রাম ও রংপুরের এই সংকটপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় অনতিবিলম্বে স্থায়ী নদীশাসন ও টি-বাঁধ নির্মাণের অনুমোদন দিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে কেবল শুকনা খাবার নয়, জরুরি পুনর্বাসনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। জলবায়ু ও নদীভাঙনের শিকার এসব প্রান্তিক মানুষকে বলির পাঁঠা বানানো বন্ধ করে সরকার কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।