বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি পরিচিত চিত্র হলো সামান্য জ্বর, মাথাব্যথা কিংবা রক্তচাপের মতো সাধারণ সমস্যাতেও মানুষ সরাসরি বড় হাসপাতালের দিকে ছুটে যায়। এতে একদিকে হাসপাতালগুলোয় যেমন অপ্রয়োজনীয় চাপ বাড়ে, অন্যদিকে রোগীদের সময় ও অর্থ—দুটিই অপচয় হয়। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ স্বাস্থ্যসমস্যা প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হলে গুরুতর জটিলতা ও চিকিৎসা ব্যয় অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন গবেষণাও দেখায়, কার্যকর প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে প্রায় ৮০ শতাংশ স্বাস্থ্যসমস্যা প্রাথমিক পর্যায়েই মোকাবিলা করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের গ্রাম ও শহর—উভয় জায়গাতেই প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এখনো শক্তভাবে গড়ে ওঠেনি।
বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ প্রতিরোধভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে অভ্যস্ত নন। বেশির ভাগ মানুষ অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসকের কাছে যান। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন কিংবা স্বাস্থ্যশিক্ষাকে গুরুত্ব দেন না। আমাদের দেশে প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতাও তুলনামূলকভাবে কম। একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগ দ্রুত যে হারে বাড়ছে, তাতে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
এ বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) স্বাস্থ্যসেবায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। তবে এই প্রযুক্তির মূল শক্তি কেবল রোগ নির্ণয়ে নয়; বরং রোগ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা, মানুষকে সচেতন করা এবং সময়মতো সঠিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এআই-নির্ভর স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ চললেও বাংলাদেশেও ইতিমধ্যে এমন একটি মডেলের বাস্তব প্রয়োগ শুরু হয়েছে, যা প্রযুক্তি ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে।
এ উদ্যোগের নাম ইন্টেলিজেন্ট জেনারেল প্র্যাকটিশনার (আইজিপি) মডেল। এটি এমন একটি মানবকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা, যেখানে প্রশিক্ষিত কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা এআই-ভিত্তিক ক্লিনিক্যাল ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি)-চালিত পয়েন্ট-অব-কেয়ার ডায়াগনস্টিক (পিওসিডি) ডিভাইস এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, স্বাস্থ্যশিক্ষা, প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছে রেফারেল এবং পরবর্তী ফলোআপ নিশ্চিত করেন।
এই মডেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রত্যেক মানুষের জন্য একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হয়। ফলে একজন ব্যক্তির স্বাস্থ্যতথ্য ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষিত থাকে এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়। কোনো ব্যক্তি উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে থাকলে তা দ্রুত চিহ্নিত করে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, স্বাস্থ্য পরামর্শ বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এতে রোগ গুরুতর হওয়ার আগেই ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয় এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসার প্রয়োজনও কমে আসে।
ধরা যাক, কুড়িগ্রামের এক গৃহবধূ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় জানতে পারলেন, তাঁর উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। তিনি আগে কোনো উপসর্গই অনুভব করেননি। কিন্তু আগেভাগেই ঝুঁকি ধরা পড়ায় স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তিনি চিকিৎসা শুরু করতে পারলেন। কয়েক বছর আগেও হয়তো একই রোগ ধরা পড়ত তখনই, যখন তিনি স্ট্রোক বা অন্য কোনো জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাতেন। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার আসল শক্তি এখানেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা। পরিবার পরিকল্পনা ও টিকাদান কর্মসূচিতে তাঁদের সফল ভূমিকা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তবে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় তাঁদের সক্ষমতা আরও বাড়ানো গেলে তাঁরা একটি পরিবারের নবজাতক থেকে শুরু করে শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী নারী, প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রবীণ—সব সদস্যের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন একই সঙ্গে পূরণ করতে পারবেন। আইজিপি মডেল সেই সুযোগই তৈরি করছে।
এআই এখানে চিকিৎসকের বিকল্প নয়; বরং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সক্ষমতা বাড়ানোর একটি কার্যকর সহায়ক। স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাঁদের রোগের ঝুঁকি দ্রুত বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য স্বাস্থ্য সমস্যা শনাক্ত এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে সহায়তা করে। এর ফলে একজন স্বাস্থ্যকর্মী আগের তুলনায় আরও দক্ষতার সঙ্গে মানসম্মত ও সময়োপযোগী স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারেন। প্রয়োজনে রোগীকে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসকের সঙ্গে যুক্ত করা হয় অথবা এলাকাভিত্তিক জিপি (জেনারেল প্র্যাকটিশনার) সেন্টারে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও রেফারেল সুবিধা নিশ্চিত করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে বিশেষায়িত হাসপাতালেও রেফার করা হয়।
এভাবে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে বিশেষায়িত হাসপাতাল পর্যন্ত একটি সমন্বিত, ডিজিটাল ও মানবকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ইকোসিস্টেম গড়ে ওঠে। গ্রামীণ এলাকায় এই মডেলটি কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং ইউনিয়ন সাব-সেন্টারকে ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রযুক্তির সঙ্গে সংযুক্ত করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কার্যকারিতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে।
অন্যদিকে শহরাঞ্চলে বাড়ি বাড়ি সেবা দেওয়ার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে এলাকাভিত্তিক জিপি সেন্টারভিত্তিক সেবাকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। এসব সেন্টারে চিকিৎসক, নার্স ও প্যারামেডিকদের সমন্বয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য পরামর্শ এবং প্রয়োজনে উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে রেফারেল নিশ্চিত করা হয়। এর মাধ্যমে শহরাঞ্চলেও কমিউনিটির অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসচেতনতা উন্নয়ন এবং সহজলভ্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার একটি কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে।
এই মডেলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর ব্যাপক সেবা পরিসর। এটি শুধু জ্বর বা সাধারণ সংক্রামক রোগ নয়; বরং ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অপুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ, কিশোর-কিশোরীর স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, প্রবীণদের স্বাস্থ্য, এমনকি স্তন ক্যানসার, চোখের স্ক্রিনিং এবং বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের প্রাথমিক স্ক্রিনিংও অন্তর্ভুক্ত করে। সেবাগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা এবং সরকারের এসেনশিয়াল সার্ভিস প্যাকেজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হয়।
স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ হয়তো শুধু আরও বড় হাসপাতাল নির্মাণে নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থায়, যেখানে মানুষ অসুস্থ হওয়ার আগেই তার স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত হবে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যশিক্ষা নিশ্চিত হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সময়মতো উপযুক্ত চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত হওয়া যাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা আইজিপি মডেল সে ভবিষ্যতেরই একটি বাস্তব ও কার্যকর রূপরেখা তুলে ধরছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কেবল ধারণা বা গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ প্রযুক্তি নয়; মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত একটি মডেল। গত এক দশকে এই মডেলের মাধ্যমে ৩০ লাখের বেশি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পেয়েছেন। স্থানীয় এনজিও ও বিভিন্ন ডেভেলপমেন্ট পার্টনারের সহযোগিতায় ৬৫টি ক্যাচমেন্ট এলাকায় ৪ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের ২৫ লাখের বেশি মানুষকে সেবা দেওয়া হয়েছে এবং ৩ হাজারের বেশি নারী স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
শুধু গ্রামাঞ্চলেই নয়, শহরাঞ্চলেও আইজিপি মডেলের প্রয়োগ ইতিমধ্যে আশাব্যঞ্জক ফলাফল দেখিয়েছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে এলাকাভিত্তিক জিপি সেন্টার ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে পরিচালিত এ উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় সহজলভ্য ও মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
ইউনিসেফের তত্ত্বাবধানে এবং পিএইচডি, নারী মৈত্রী ও সিমেড হেলথের সহযোগিতায় পরিচালিত ছয়টি ‘আলো ক্লিনিক’ ইতিমধ্যে প্রায় ৫ লাখ মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিয়েছে। এই মডেলের সাফল্য ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) ইউনিসেফের সহযোগিতায় গত ৯ জুলাই ২০২৬ একটি অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মশালার আয়োজন করে। সেখানে ‘আলো ক্লিনিক’ থেকে প্রাপ্ত প্রমাণভিত্তিক ফলাফল ও শিক্ষা উপস্থাপন করা হয়, যা শহরাঞ্চলের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী করতে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
এই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ব্র্যাকের সঙ্গে অংশীদারত্বে ঢাকার উত্তরায় ‘আমাদের সুস্বাস্থ্য’ উদ্যোগের মাধ্যমে সব শ্রেণির আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী, প্রযুক্তিনির্ভর ও মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হচ্ছে। এ উদ্যোগ দেখিয়ে দিচ্ছে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যভিত্তিক সেবার সমন্বয়ে শহরাঞ্চলেও একটি কার্যকর ও টেকসই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
প্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থার আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর সাশ্রয়ী ব্যয়। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলে পরিবারপ্রতি প্রায় ১ দশমিক ৫ মার্কিন ডলার এবং শহরে প্রায় ৩ মার্কিন ডলার ব্যয়ে সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা সম্ভব, যেখানে ওষুধ, টিকা ও পরিবার পরিকল্পনার উপকরণ ব্যতীত প্রয়োজনীয় অধিকাংশ সেবা অন্তর্ভুক্ত থাকে।
আইজিপি মডেল শুধু ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবাই নয়, পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন হেলথ’ ব্যবস্থারও সম্ভাবনা তৈরি করে। প্রতিটি ইউনিয়নভিত্তিক জিপি সেন্টারে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক নেট মিটারিং ব্যবস্থা চালু করলে বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ হ্রাস ও কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা স্বাস্থ্যসেবার আর্থিক ও পরিবেশগত টেকসইতা আরও জোরদার করতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অঙ্গীকারে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ডিজিটাল স্বাস্থ্য অ্যাকাউন্ট ও ই-হেলথ কার্ড চালুর পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে এআই-ভিত্তিক কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা মডেল ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি কার্যকর ভিত্তি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাঁরা আরও মনে করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত এই মডেল দ্বারা সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং মানসম্মত সেবা প্রদানের মাধ্যমে কমিউনিটির ৮০ শতাংশ পর্যন্ত স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধান সম্ভব।
এই উদ্যোগ সরকারের দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি ও স্বাস্থ্য খাতে মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যকেও এগিয়ে নিতে পারে। এর মাধ্যমে প্রায় এক লাখ প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রযুক্তিনির্ভর প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। তাঁরা মানুষের দোরগোড়ায় সহজে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।
স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ হয়তো শুধু আরও বড় হাসপাতাল নির্মাণে নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থায়, যেখানে মানুষ অসুস্থ হওয়ার আগেই তার স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত হবে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যশিক্ষা নিশ্চিত হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সময়মতো উপযুক্ত চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত হওয়া যাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা আইজিপি মডেল সে ভবিষ্যতেরই একটি বাস্তব ও কার্যকর রূপরেখা তুলে ধরছে।
একসময় স্বাস্থ্যসেবার মূল দর্শন ছিল—রোগ হলে চিকিৎসা। কিন্তু আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা আজ রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে এই পরিবর্তন সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে স্বাস্থ্য ব্যয় কমানো, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরও ত্বরান্বিত হবে।
বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কারের অঙ্গীকারে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ডিজিটাল স্বাস্থ্য অ্যাকাউন্ট, ই-হেলথ কার্ড ও শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, আইজিপি মডেল সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে একটি কার্যকর ও সময়োপযোগী মাধ্যম হতে পারে। একই সঙ্গে এটি দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী গড়ে তোলা, স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা, স্বাস্থ্যসেবার মান ও জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং মানুষের দোরগোড়ায় সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
-
অধ্যাপক ড. খন্দকার আবদুল্লাহ আল মামুন ভাইস প্রেসিডেন্ট, এআই, ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনিউরশিপ, ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, যুক্তরাষ্ট্র। অধ্যাপক, সিএসই বিভাগ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ)।
মতামত লেখকের নিজস্ব