সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / মুমিন কেন পাপ করে: ইবনে আতাউল্লাহর বিস্ময়কর দর্শন
মুমিন কেন পাপ করে: ইবনে আতাউল্লাহর বিস্ময়কর দর্শন

মুমিন কেন পাপ করে: ইবনে আতাউল্লাহর বিস্ময়কর দর্শন

জীবনের পথচলায় কখনো কখনো প্রবৃত্তি ও ভুলের কালো মেঘ আমাদের অন্তরকে ঢেকে ফেলে। কিন্তু পাপের এই সাময়িক অন্ধকার কি শুধুই ধ্বংসের বার্তা বয়ে আনে, নাকি এর গভীরে লুকিয়ে থাকে স্রষ্টার এক পরম রহমত ও করুণার আলো?

বিখ্যাত সুফি দার্শনিক শেখ আহমদ ইবনে আতাউল্লাহ সিকান্দারির এ বিষয়ে একটি বিস্ময়কর উক্তি রয়েছে, যা বহু যুগ ধরে আলোচিত।

ইবনে আতাউল্লাহ (১২৫৮–১৩০৯ খ্রি.) ছিলেন মিসরের প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ, মালেকি মাজহাবের ফকিহ (আইনজ্ঞ) এবং বিশ্ববিশ্রুত সুফি সাধক। মিসরের ঐতিহাসিক বন্দরনগরী আলেক্সান্দ্রিয়ায় (আরবিতে ‘সিকান্দরিয়া’) তাঁর জন্ম। পরে তিনি কায়রোতে অবস্থান করেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।

আধ্যাত্মিক সাধনায় তিনি ‘শাজিলি’ সুফি তরিকার তৃতীয় প্রধান শায়খ এবং এ তরিকার প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবুল হাসান আশ-শাজিলি ও শায়খ আবু আল-আব্বাস আল-মুর্সির প্রধান উত্তরসূরি ছিলেন। বিশেষ করে তাসাউফ, আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের গভীর তত্ত্ব সম্পর্কিত কালজয়ী রচনার জন্য তিনি মুসলিম বিশ্বে স্মরণীয় হয়ে আছেন। 

তিনি লিখেছেন, “হয়তো তোমার ওপর পাপাচারের অন্ধকার মেঘ নেমে আসে শুধু এ কারণেই, যেন মহান আল্লাহ তোমাকে জানিয়ে দিতে পারেন তিনি তোমাকে কতটা নিয়ামত ও অনুগ্রহের আলো দিয়ে ধন্য করেছেন।” (ড. মুহাম্মদ সাইদ রমাদান আল-বুতি, আল-হিকাম আল-আতাইয়্যাহ: শারহ ওয়া তাহলিল, খণ্ড ২ (হিকমাহ ৯৪), দারুল ফিকর আল-মুআসির, বৈরুত ও দামেস্ক, ২০০৩)

অন্তরে আলো–অন্ধকারের দ্বন্দ্ব

ইবনে আতাউল্লাহর ভাষায় ‘অন্ধকার’ বলতে বোঝানো হয়েছে পাপাচার, অন্যায় প্রবৃত্তি এবং ভুলের কারণে অন্তরে সৃষ্ট গ্লানি ও হতাশাকে। অন্যদিকে, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর ভয় এবং ভক্তির অনুভূতির মাধ্যমে অন্তরে যে প্রশান্তি তৈরি হয়, তা-ই হলো হেদায়েতের ‘আলো’।

আলো আর অন্ধকার কখনো একই স্থানে একসঙ্গে বসবাস করতে পারে না। যখন কোনো বিশ্বাসী মানুষের অন্তরে পাপের অন্ধকার প্রবেশ করে, তখন তার অন্তরে এক তীব্র অস্বস্তি ও ছটফটানি শুরু হয়। জাগতিক কোনো ক্ষণস্থায়ী আনন্দই তাকে সেই ভেতরের অস্থিরতা থেকে মুক্তি দিতে পারে না।

আর এই অস্থিরতাই তাকে ঠেলে দেয় মহান আল্লাহর অসীম রহমতের দরবারে। সে ব্যাকুল হয়ে স্রষ্টার কাছে ক্ষমা ও সাহায্য প্রার্থনা করে।

এক পাপের বিপরীতে দুটি মহান নেয়ামত

যখন কোনো ভুল করে ফেলার পর বান্দা অনুতপ্ত হয়ে মহান আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তখন সে শুধু একটি নয়, বরং দুটো মহান নেয়ামত লাভ করে।

প্রথম নেয়ামত হলো, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন, তার তওবা কবুল করেন এবং মনের অস্থিরতা দূর করে প্রশান্তি দান করেন। আর দ্বিতীয় হলো, বান্দা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে যে মহান আল্লাহ এখনও তাকে কতটা ভালোবাসেন ও তার যত্ন নেন।

তাই তিনি তাকে পাপাচারের অন্ধকারের মধ্যে চিরতরে ফেলে রাখেননি, বরং অনুশোচনা দিয়ে টেনে বের করে এনেছেন।

দ্বিতীয় নেয়ামতটি প্রথমটির চেয়েও কোনো অংশে কম নয়। কারণ আল্লাহ যদি বান্দার প্রতি দয়া না করতেন, তবে সে পাপে মগ্ন থেকেও নিজেকে সুখী মনে করত এবং ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যেত।

দুটি মানুষের ভিন্ন জীবনচিত্র

বিষয়টি সহজভাবে বোঝার জন্য দুটি পরিস্থিতির কথা চিন্তা করা যেতে পারে।

প্রথম পরিস্থিতিতে এমন এক ব্যক্তি, যে অনায়াসে পাপ করে যাচ্ছে এবং সেই পাপে সে কোনো অপরাধবোধ বা কষ্ট অনুভব করছে না; বরং উল্টো আনন্দ পাচ্ছে। এমন মানুষকে মূলত তার নিজের খারাপ প্রবৃত্তির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, যা তাকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

অন্যদিকে দ্বিতীয় পরিস্থিতিতে এমন এক ব্যক্তি, যে ভুলক্রমে কোনো পাপে জড়িয়ে পড়ার পর অন্তরে প্রচণ্ড অপরাধবোধ ও অস্থিরতা অনুভব করে। সেই ভুলটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায় এবং সে অবিলম্বে তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে কান্না করে।

স্পষ্টতই, এই দ্বিতীয় ব্যক্তির ওপর মহান আল্লাহর খাস রহমত রয়েছে। কারণ আল্লাহ তার অন্তরে পাপের প্রতি ঘৃণা তৈরি করে দিয়েছেন, যাতে সে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে পারে।

কোরআনে শয়তানের চ্যালেঞ্জের জবাবে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সুরক্ষা সম্পর্কে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন। শয়তান বলেছিল যে সে মানুষকে বিভ্রান্ত করবে, তবে আল্লাহর নিষ্ঠাবান বান্দাদের ওপর তার কোনো ক্ষমতা থাকবে না। (সুরা হিজর, আয়াত: ৩৯-৪০)

আল্লাহ–তাআলা প্রত্যুত্তরে বলেছেন, নিশ্চয়ই যারা আমার প্রকৃত বান্দা, তাদের ওপর তোর কোনো প্রভাব বা ক্ষমতা থাকবে না; শুধু সেই বিভ্রান্তরা ছাড়া যারা তোর অনুসরণ করে। (সুরা হিজর, আয়াত: ৪১-৪২)

পাপ প্রকাশ করার কুফল

পাপের পর অনুশোচনা ও ক্ষমা পাওয়ার এই দরজা সবার জন্য খোলা থাকলেও এক শ্রেণির মানুষ এই রহমত থেকে বঞ্চিত হয়—তারা হলো অহংকারী ও প্রকাশ্যে পাপকারী ব্যক্তি।

মহানবী (সা.) বলেছেন, আমার উম্মতের সকল ব্যক্তির অপরাধ ক্ষমা করা হবে, শুধু তারা ব্যতিরেকে যারা প্রকাশ্যে পাপ করে (যাদের বলা হয় ‘মুজাহিরিন’)। প্রকাশ্যে পাপ করার একটি উদাহরণ হলো—কোনো ব্যক্তি রাতে একটি অন্যায় কাজ করল, যা আল্লাহ গোপন রাখলেন; কিন্তু সকালে উঠে সে লোকজনকে বলতে লাগল, ‘হে অমুক, আমি কাল রাতে এই এই কাজ করেছি।’ অথচ সে রাতে তার প্রতিপালক তাকে ঢেকে রেখেছিলেন, আর সকালে সে নিজেই আল্লাহর সেই গোপন রাখার পর্দা তুলে দিল। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৬৯)

পাপের পর অনুশোচনা ও ক্ষমা পাওয়ার এই দরজা সবার জন্য খোলা থাকলেও এক শ্রেণির মানুষ এই রহমত থেকে বঞ্চিত হয়—তারা হলো অহংকারী ও প্রকাশ্যে পাপকারী ব্যক্তি।

ক্ষমার অসীম দিগন্ত

কিন্তু যে বান্দা বিনয়ী ও খাঁটি মনে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসে, তার জন্য ক্ষমার কোনো সীমা নেই।

হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “হে আদমসন্তান, তুমি যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে ডাকবে এবং আমার কাছে আশা রাখবে, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব—তা তোমার পাপ যতই বেশি হোক না কেন। হে আদমসন্তান, তোমার পাপ যদি আকাশের মেঘমালা স্পর্শ করে এবং তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব। হে আদমসন্তান, তুমি যদি পৃথিবী ভরা পাপ নিয়েও আমার কাছে আসো এবং আমার সঙ্গে কাউকে শরিক না করে থাকো, তবে আমি পৃথিবী ভরা ক্ষমা নিয়ে তোমার সামনে উপস্থিত হব।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৪০)

About Editor Todaynews24

Check Also

মাগুরায় শ্রদ্ধা-সম্মানে পালিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস

যথাযথ মর্যাদা ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মাগুরায় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে শহরের বিভিন্ন স্তরের মানুষের অংশগ্রহণে নানা কর্মসূচি পালিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *