Home / সকল আপডেট / বাঁশের চাঁইয়ে নির্বিচার নিধন হচ্ছে পাঙাশের পোনা
বাঁশের চাঁইয়ে নির্বিচার নিধন হচ্ছে পাঙাশের পোনা

বাঁশের চাঁইয়ে নির্বিচার নিধন হচ্ছে পাঙাশের পোনা

সন্ধ্যা নামার পর নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয় বিশাল আকৃতির বাঁশের চাঁই। ছয় ঘণ্টা পর সেগুলো তোলা হলে উঠে আসে হাজার হাজার পাঙাশের পোনা। সঙ্গে আসে অন্যান্য ছোট মাছ। নদীর ৪০ থেকে ৫০ ফুট গভীরে পেতে রাখা এই ফাঁদ সহজে শনাক্ত করতে পারে না প্রশাসনও। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীতে সংঘবদ্ধ চক্রের হাতে ধ্বংস হচ্ছে পাঙাশের ভবিষ্যৎ। এই চক্রের সঙ্গে জেলে, আড়তদার, মাছ ব্যবসায়ী ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত বলে অভিযোগ আছে।

মৎস্য বিভাগ, জেলে, গবেষক ও বাজার-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশের সবচেয়ে বড় অভয়াশ্রম হচ্ছে মেঘনা অভয়াশ্রম। বরগুনার বিষখালী-বলেশ্বর-পায়রা মোহনা, মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনা, তেঁতুলিয়া, সুগন্ধা, আড়িয়াল খাঁ, বুড়াগৌরাঙ্গসহ বিভিন্ন নদ–নদীতে দীর্ঘদিন ধরে পাঙাশের পোনা নিধন চলছে। পরে এসব পোনা বাজারে ‘নদীর ট্যাংরা’ নামে বিক্রি করা হয়।

মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, পাঙাশের প্রধান প্রজনন মৌসুম মে থেকে সেপ্টেম্বর। মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত নদীতে বেশি পোনা পাওয়া গেলেও এখন প্রায় সারা বছরই চাঁই দিয়ে পোনা ধরা হচ্ছে। এতে নদীর প্রাকৃতিক পাঙাশের মজুত মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

‘লাইভ লোকেশন’ দিয়ে চাঁই

মৎস্য বিভাগ জানায়, সন্ধ্যার পর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নদীর গভীরে এসব চাঁই ফেলে চক্রটি। পানির নিচে ডুবে থাকা চাঁইয়ের অবস্থান মনে রাখতে তাঁরা হোয়াটসঅ্যাপের ‘লাইভ লোকেশন’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। ছয় ঘণ্টা পর নির্দিষ্ট স্থানে ফিরে এসে চাঁই তুলে নেয়। স্থানীয় লোকজনের তথ্যের ভিত্তিতে মাঝেমধ্যে দু-একটি চাঁই জব্দ করা গেলেও এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা যায় না। ফলে চক্রটি নির্বিঘ্নে একই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

বরিশালের হিজলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, সন্ধ্যার পর নদীর গভীরে এসব চাঁই ফেলা হয়। এগুলো এত গভীরে থাকে যে দুই-তিন ঘণ্টা অনুসন্ধান করেও অনেক সময় শনাক্ত করা যায় না। পুরো দক্ষিণাঞ্চলে এমন কয়েকটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। নিয়মিত অভিযান চালালেও এগুলো জব্দ করা কঠিন।

বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি প্রতিটি চাঁই ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। নদীতে ফেলার আগে চাঁইয়ের ভেতরে শুঁটকি, খৈল, কুঁড়া, চিনি, চিড়া ও মাছের তেল মিশিয়ে তৈরি মণ্ড রাখা হয়। জোয়ারের স্রোতে ভেসে আসা অসংখ্য পাঙাশের পোনা ওই টোপে আকৃষ্ট হয়ে চাঁইয়ের ভেতরে আটকা পড়ে।

অভিযান ও চাঁই জব্দ

গত ২০ জুলাই বরগুনার পাথরঘাটার পদ্মা স্লুইসগেট-সংলগ্ন বলেশ্বর নদের তীর থেকে চারটি বিশাল চাঁই স্থানীয় লোকজন জব্দ করেন। পরে কোস্টগার্ড ও মৎস্য বিভাগ সেগুলো পুড়িয়ে ধ্বংস করে। স্থানীয় জেলে আবুল কালাম বলেন, একেকটি চাঁই এত বড় যে এর ভেতরে দুই থেকে তিনজন অনায়াসে ঢুকতে পারেন। প্রতিটিতে আড়াই থেকে তিন মণ পর্যন্ত মাছ ধরা পড়ে।

গত ১ মে গভীর রাতে বরগুনার তালতলীর পায়রা-বিষখালী-বলেশ্বর মোহনা থেকে দুটি চাঁই উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। এ সময় বাউফলের দুই জেলেকে আটক করে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

অবৈধ চাঁই ও ছোট ফাঁসের জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানান কোস্টগার্ডের পাথরঘাটা স্টেশনের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার রফিকুল ইসলাম।
ভোলার তিনজন মৎস্য ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে শুধু বাউফল নয়, মুন্সিগঞ্জ, চরফ্যাশন ও মনপুরাতেও এসব চাঁই তৈরি হচ্ছে। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি প্রতিটি চাঁই ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। নদীতে ফেলার আগে চাঁইয়ের ভেতরে শুঁটকি, খৈল, কুঁড়া, চিনি, চিড়া ও মাছের তেল মিশিয়ে তৈরি মণ্ড রাখা হয়। জোয়ারের স্রোতে ভেসে আসা অসংখ্য পাঙাশের পোনা ওই টোপে আকৃষ্ট হয়ে চাঁইয়ের ভেতরে আটকা পড়ে।

‘ট্যাংরা’ নামে বিক্রি

বরিশাল নগরের চৌমাথা, বাংলাবাজার ও পোর্ট রোড ঘুরে দেখা গেছে, ৩ থেকে ৭ ইঞ্চি আকারের এসব পাঙাশের পোনা প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মৎস্য কর্মকর্তারা জানান, প্রকৃত ট্যাংরা একটি স্বতন্ত্র ক্যাটফিশ প্রজাতি। কিন্তু বাজারে পাঙাশের পোনাকেই ‘পাঙাশ-ট্যাংরা’ বা ‘নদীর ট্যাংরা’ নামে বিক্রি করা হচ্ছে। ট্যাংরা মাছের পিঠ কালচে এবং পেট রুপালি-সাদা হয়। এদের ফুলকা ধূসর-বাদামি রঙের হয়ে থাকে, তবে পাঙাশের পোনার গড়ন ও আকৃতিতে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। এর পিঠ কালচে ও ফুলকা গাঢ় বাদামি এবং মাথা ছোট, মুখ কিছুটা প্রশস্ত ও নিচের চোয়াল সামান্য বড়।

নগরের চৌমাথা বাজারের মাছ বিক্রেতা মো. জিহাদ বলেন, পাঙাশ-ট্যাংরা হিসেবেই জানেন। আড়ত থেকে এনে বিক্রি করেন। পাঙাশের পোনা আর ট্যাংরা যে আলাদা প্রজাতি, সেটা তাঁর জানা ছিল না।

গবেষণার চিত্র

২০১৭ সালে ইকোফিশ বাংলাদেশ প্রকল্পের আওতায় শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে তেঁতুলিয়া নদীকেন্দ্রিক এক গবেষণায় পাঙাশের গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়।

গবেষণায় ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন এলাকা শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ছিল হাদির চর, চরগুণী, মাঝের চর, পাতার চর, চর বোরহান, চর কলমি, চর কাজল, বনতলী, চর মন্তাজ, চর বিশ্বাস, ছোট বাইশদিয়া ও চালিতাবুনিয়া।

২০১৯ সালে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিচরণক্ষেত্র শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে আছে মেহেন্দীগঞ্জের নলবুনিয়াসংলগ্ন মেঘনা, বরগুনার পায়রা-বিষখালী-বলেশ্বর মোহনা, বিষখালীর কালমেঘা, সুগন্ধা, আড়িয়াল খাঁ, কালাবদর, তেঁতুলিয়া-মেঘনা এবং পদ্মা-মেঘনার সংযোগস্থল।

ওই গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ২০ জন জেলে প্রতিদিন চাঁই ব্যবহার করে গড়ে ১২০ কেজি করে পাঙাশের পোনা ধরছেন। যেখানে ৪০টি পোনা মিলিয়ে ১ কেজি হয়। সে হিসাবে ছয় মাসে অন্তত দুই কোটি পোনা নিধন হয়েছে।

মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় জেলেদের ধারণা, বর্তমানে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি লোকজন এই অবৈধ পদ্ধতিতে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত।

পাঙাশ আবার হুমকিতে

২০১৪ সালের পর ইকোফিশ ও মৎস্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ফলে ইলিশের পাশাপাশি নদীর পাঙাশের সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছিল বলে জানান গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, বর্তমানে যেভাবে পাঙাশের পোনা নিধন হচ্ছে, তাতে প্রজাতিটি আবার হুমকির মুখে পড়তে পারে। এই চক্র দ্রুত দমন করা না গেলে দেশের নদ-নদীতে পাঙাশের প্রজনন ও উৎপাদন আবার তলানিতে নেমে যেতে পারে। তাই অবৈধ চাঁই ও এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান প্রয়োজন।

এসব অবৈধ চাঁই মাছের বংশবিস্তারের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেন বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মো. আনিসুজ্জামান। তিনি বলেন, জেলা ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছর কতগুলো চাঁই জব্দ করা হয়েছে, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তথ্য যাচাই করে পরে জানানো যাবে।

About Editor Todaynews24

Check Also

যেদিন এল গেন্দু মিয়ার বাস

যেদিন এল গেন্দু মিয়ার বাস

‘ইশ্! একনা আগোত আইসলে তো দেইখপার পাইলেন হয়। বাস তো খানেক আগোত গেইল। বইসো, আবার আইসপে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *