কে-পপের বিশ্বজয়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে কে-বিউটির চিরচেনা সৌন্দর্যের সংজ্ঞাও। শুধু ফর্সা ত্বক নয়, এখন বৈচিত্র্যই নতুন সৌন্দর্য। অন্তর্ভুক্তির এই পরিবর্তনে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় কোরিয়ান বিউটি ব্র্যান্ডগুলো, খুলছে আরও সবার জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা।
একসময় কে-বিউটির কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে উঠত কাচের মতো স্বচ্ছ ত্বক, হালকা গোলাপি আভা আর নিখুঁত মেকআপ। দক্ষিণ কোরিয়ার বিউটি ইন্ডাস্ট্রি দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি সৌন্দর্যের মানদণ্ড তৈরি করেছিল, যেখানে ফর্সা ত্বকই যেন ছিল সৌন্দর্যের একমাত্র ভাষা। কিন্তু সময় বদলেছে। কে-পপ, কে-ড্রামা আর কোরিয়ান সংস্কৃতি যেমন পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছে, তেমনি বদলে দিচ্ছে কে-বিউটির ধারণাও। এখন সৌন্দর্যের সংজ্ঞায় জায়গা পাচ্ছে গাঢ়, শ্যামলা, জলপাই কিংবা মেলানিনসমৃদ্ধ সব ধরনের ত্বক।
বিশ্বব্যাপী কে-বিউটির এই পরিবর্তন শুধু প্রসাধনীর রঙে নয়, বরং সৌন্দর্যকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতেও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
কে-পপের ভক্তরা বিশ্বজুড়ে, কে-বিউটি ছিল সীমাবদ্ধ

আজ বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে ব্ল্যাকপিঙ্ক, বিটিএস কিংবা স্ট্রে কিডসের কনসার্টে গেলে দেখা যাবে হাজারো ভক্ত। এরা কেউ লাতিন আমেরিকা থেকে, কেউ আফ্রিকা, কেউ মধ্যপ্রাচ্য, কেউ ইউরোপ বা দক্ষিণ এশিয়া থেকে এসেছেন। ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, ত্বকের রংও ভিন্ন। কিন্তু কে-পপের প্রতি ভালোবাসা তাদের এক করেছে।
মজার বিষয় হলো, এই বৈচিত্র্যময় দর্শকদের জন্যই যখন কোরিয়ান সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তখনও কে-বিউটির অনেক ব্র্যান্ড মূলত হালকা ত্বকের মানুষের জন্যই প্রসাধনী তৈরি করছিল। ফাউন্ডেশন, কনসিলার কিংবা কুশন কমপ্যাক্ট। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মিলত মাত্র দুই বা তিনটি শেড।
ফলে গাঢ় বা শ্যামলা ত্বকের মানুষের কাছে কে-বিউটির স্কিনকেয়ার যতটা আকর্ষণীয় ছিল, মেকআপ ততটাই হতাশার।
সৌন্দর্যের মানদণ্ডে ফাটল ধরিয়েছে কে-পপ

কে-পপ শুধু সংগীতের জগৎ বদলায়নি, বদলেছে ফ্যাশন ও সৌন্দর্যের ধারণাও। জি-ড্রাগন বহু বছর ধরেই নারীদের পোশাক, গয়না কিংবা মেকআপ নিজের মতো ব্যবহার করে প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক ফ্যাশনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। স্ট্রে কিডসের ফেলিক্স কখনো অ্যাঞ্জেল লুকে, আবার কখনো গথিক লুকে হাজির হন। এটিজের সিওংহোয়া কিংবা বিটিএসের সদস্যরাও নিয়মিত স্কিনকেয়ার ও প্রসাধনী ব্যবহার করে পুরুষদের সৌন্দর্যচর্চাকে স্বাভাবিক করে তুলেছেন।
অর্থাৎ কে-পপ যেখানে বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করেছে, সেখানে কে-বিউটির অনেক অংশ তখনও পুরোনো সৌন্দর্যের সংজ্ঞায় আটকে ছিল।
সমালোচনাই বদলে দিল জনপ্রিয় ব্র্যান্ডকে

বিশ্ববাজারে পরিবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ‘টিরটির’। ২০২৩ সালে তাদের বহুল জনপ্রিয় ‘মাস্ক ফিট রেড কুশন ফাউন্ডেশন’ পাওয়া যেত মাত্র তিনটি শেডে। আর তা হচ্ছে পোরসেলিন, আইভরি ও স্যান্ড।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক বিউটি কনটেন্ট নির্মাতা অভিযোগ করেন, এত জনপ্রিয় একটি ব্র্যান্ডে তাদের ত্বকের সঙ্গে মানানসই কোনো শেডই নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হলে টিরটির দ্রুত সিদ্ধান্ত বদলায়।
প্রথমে শেড বাড়িয়ে করা হয় নয়টি। পরে তা পৌঁছে যায় ৪০-এ। এখন বিশেষ অর্ডারের মাধ্যমে আরও অনেক শেড তৈরি করিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। ব্র্যান্ডটির ভাষায়, এই পরিবর্তনের ফলে শুধু বিক্রি বাড়েনি, গ্রাহকদের বিশ্বাসও অনেক বেড়েছে। তাদের মতে, অন্তর্ভুক্তি কোনো প্রচারণা নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব।
কে-বিউটির নতুন নায়ক কালো ত্বক

এই পরিবর্তনের আরেকটি বড় উদাহরণ ‘কে+ব্রাউন’। ব্র্যান্ডটির সহপ্রতিষ্ঠাতা মেলিসা আলফার জানান, কে-পপ কনসার্টে তিনি দেখেছেন আফ্রিকান, লাতিন আমেরিকান, দক্ষিণ এশিয়ান, এমনকি মধ্য প্রাচ্যের হিজাব পরা তরুণী। অর্থাৎ নানা ত্বকের মানুষ কে-পপ নিয়ে উচ্ছ্বসিত। কিন্তু কে-বিউটির বিজ্ঞাপন বা পণ্যে তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি তৈরি করেন এমন একটি স্কিনকেয়ার ব্র্যান্ড, যা শুরু থেকেই মেলানিনসমৃদ্ধ ত্বকের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে তৈরি।
মজার বিষয় হলো, পণ্য বাজারে আসার আগেই কয়েক হাজার মানুষের অপেক্ষমাণ তালিকা তৈরি হয়ে যায়। দক্ষিণ কোরিয়া সরকারও এই উদ্যোগকে সমর্থন দিয়েছে।
শুধু মেকআপ নয়, বদলাচ্ছে পুরো বাজার

বিশ্বব্যাপী কে-বিউটির বাজার এখন প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের শিল্প।
একসময় কোরিয়ান প্রসাধনী কিনতে বিদেশি ক্রেতাদের অনলাইনের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পোল্যান্ডসহ ইউরোপ ও আমেরিকার অসংখ্য দোকানে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে কে-বিউটি ব্র্যান্ড।
দক্ষিণ কোরিয়ার বড় বিউটি চেইন অলিভ ইয়াং যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রসাধনী বিক্রয়কেন্দ্রগুলোও কোরিয়ান ব্র্যান্ডকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে আরও এগিয়ে যেতে হলে কে-বিউটির সামনে একটাই পথ। সব ধরনের ত্বককে সমান গুরুত্ব দেওয়া।
বদলাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়াও

দক্ষিণ কোরিয়া একসময় ছিল তুলনামূলকভাবে একজাতিক সমাজ। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিয়ে, বিদেশি কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক যোগাযোগের কারণে দেশটিও এখন দ্রুত বহুসাংস্কৃতিক সমাজে পরিণত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কে-বিউটির পণ্য একসময় মূলত কোরিয়ানদের জন্য তৈরি হলেও এখন এর প্রধান ক্রেতারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ। ফলে বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করা এখন শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়, ব্যবসায়িক প্রয়োজনও।
সৌন্দর্যের সংজ্ঞা এখন আরও বড়

আজকের কে-বিউটির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত শেডের সংখ্যা নয়, বরং মানসিকতার পরিবর্তন।
সৌন্দর্য এখন আর কোনো নির্দিষ্ট রঙের ত্বক, বয়স কিংবা চেহারায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রতিটি মানুষের নিজস্ব ত্বক, পরিচয় ও সৌন্দর্যকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
যে শিল্প একসময় ফর্সা ত্বককে সৌন্দর্যের একমাত্র প্রতীক হিসেবে তুলে ধরত, সেই শিল্পই আজ বৈচিত্র্যকে নতুন শক্তি হিসেবে গ্রহণ করছে।
হয়তো এ কারণেই কে-বিউটির আগামী অধ্যায় আর শুধু কোরিয়ার নয়। এটি এমন এক সৌন্দর্যের গল্প, যেখানে আয়নার সামনে দাঁড়ানো প্রতিটি মানুষ নিজেকে দেখতে পারে। নিজের ত্বকের রঙ, পরিচয়ে ও আত্মবিশ্বাসে।
সূত্র: সিএনএন, ভোগ ও এল