সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / আমি একজন প্রেমিক হতে চেয়েছিলাম
আমি একজন প্রেমিক হতে চেয়েছিলাম

আমি একজন প্রেমিক হতে চেয়েছিলাম

আমি এই জীবনে কিচ্ছু হতে চাইনি। না বড় অফিসার, না বড় ব্যবসায়ী, না কোনো বিখ্যাত মানুষ। শুধু একজন প্রেমিক হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে ভাগ্যও আমার হলো না।

ছোটবেলায় এক মেয়েকে দেখে ভালো লাগায় ডুবে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, এই পরিটাকে আমার চাই-ই চাই। কিন্তু বিধিবাম! সে যে বড় অফিসারের মেয়ে। চোখ তুলে তার দিকে তাকানোই যেন মহা অন্যায়। আমার মতো সাধারণ ছেলের ভালো লাগারও যেন কোনো অধিকার নেই। এক রাশ দুঃখ নিয়ে ফিরে এলাম।

এরপর স্কুলে একজনকে পছন্দ হলো। ভাবলাম, এবার বুঝি প্রেমিক হওয়ার স্বপ্নটা পূরণ হবে। কিন্তু তাকে মনের কথা বলার আগেই কী নিয়ে তার সঙ্গে চরম ঝগড়া! একেবারে মারামারি।

ভাবা যায়? যার সঙ্গে প্রেম করার কথা, তার সঙ্গেই হাতাহাতি!

পরে স্যার ডেকে নিয়ে আমাদের বোঝালেন। কিন্তু ততক্ষণে আমার হৃদয় ভেঙে গেছে। এদিকে একের পর এক প্রেম করে যাচ্ছে আমার বন্ধুরা। তাদের প্রেমের গল্প শুনে ভাবতাম—

দেখতে তো আমি খারাপ নই। কথা বলতেও পারি। তাহলে প্রেমটা আমার হচ্ছে না কেন?

আমার অপরাধটা কী? কলেজে ভর্তি হলাম। ওমা! সেখানে মেয়েই হাতে গোনা কয়েকজন। তবুও একজন ছিল—সম্পা।

বেশ সুন্দর। কিন্তু তার সঙ্গে কথা বলার জন্যও প্রায়ই লাইনে দাঁড়াতে হতো। মনে হতো, প্রেম নয়—যেন সরকারি কোনো সেবা নিতে এসেছি।

এক বন্ধু একদিন আমাকে তার কলেজে নিয়ে গেল। সেখানে অনেক মেয়ে। অনেক!

আমার চোখে তখন যেন নতুন পৃথিবীর দরজা খুলে গেল।

ভাবলাম, এখানেই ভর্তি হব। এখানেই হয়তো আমার প্রেমিক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে। কিন্তু পরিবার রাজি হলো না। আশার আলোতে আবার অন্ধকার নেমে এল।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে ভাবলাম—এবার বুঝি আর কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না। এবার আমি একজন প্রেমিক হবই। কিন্তু কারও সঙ্গেই ভাব হলো না। কেউ আমার দিকে তাকাল না। কেউ আমার অপেক্ষায় থাকল না।

কেউ কোনো দিন বলল না, ‘তুমি না এলে আমার দিনটা অসম্পূর্ণ লাগে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ না করেই গ্রামে চলে এলাম।

জীবনটা তখন ছন্নছাড়া। পরে গ্রাম থেকেই বিকম পাস করে ফিরে এলাম ঢাকায়। কেমন করে যেন একটা চাকরি হয়ে গেল।

সেলস অফিসার।

দোকানে দোকানে ঘুরি। অর্ডার কাটি। জীবনে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা জমতে থাকে। আর এই সময়েই জীবনে এসেছিল সবচেয়ে সুন্দর ভালো লাগাটা। অবশ্য, হয়তো সেটা একতরফাই ছিল। আমি মিরপুর ১২ থেকে বিআরটিসির বাসে কুড়িল বিশ্বরোড যেতাম।

তখনো কালশী ব্রিজ হয়নি। কাজীপাড়া থেকে একটি মেয়ে বাসে উঠত। ক্যামব্রিয়ান কলেজে পড়ত। সে–ও নামত কুড়িল বিশ্বরোডে।

প্রায় প্রতিদিন আমাদের চোখে চোখে কথা হতো। কথা নয়—চোখের ভাষায় কিছু একটা। বাস থেকে একসঙ্গে নামতাম।

কিছুটা পথ পাশাপাশি হাঁটতাম। কখনো সে কিছু বলত না।

আমিও না।

তবু মনে হতো, আমাদের মধ্যে বুঝি অনেক কথা হয়ে যাচ্ছে।

প্রতিদিন মনে মনে ভাবতাম—

আজ বলব।

আজ অবশ্যই বলব। ‘তোমাকে আমার ভালো লাগে।’

কিন্তু মুখ ফুটে আর বলা হয়ে উঠত না।

আমার এই মুখচোরা স্বভাবই একদিন আমার কাল হয়ে দাঁড়াল।

একদিন দেখলাম, মেয়েটি একটি ছেলের সঙ্গে রিকশায় যাচ্ছে।

সাহস করে পিছু নিলাম।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo.com

তারপর যা জানলাম, তাতে বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল।

ছেলেটিকে সে অনেক দিন ধরেই পছন্দ করে। আমি এত দিন যে চোখের ভাষা পড়ছিলাম, হয়তো সেই চোখ অন্য কারও নামই লিখে রেখেছিল।

তারপরও আমি হাল ছাড়িনি। জীবনে তো আর কোনো কিছুর অভাব নেই।

চাকরি আছে।

বেতন আছে।

খাওয়া আছে।

ঘুম আছে।

শুধু একজন প্রেমিক হওয়ার সৌভাগ্যটা নেই।

এই তো আরেক মেয়ের সঙ্গে সবে ভাব হয়েছে।

এবার আর ভুল করব না। এবার মনের কথাটা বলেই দেব।

যেদিন বলতে যাব, সেদিনই সে বাসে বাচ্চা একটি মেয়ে নিয়ে উঠল।

সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল—

‘এটা তোমার আঙ্কেল। সালাম দাও।’

আমি জানি না, এত এত মানুষ থাকতে আমি কেন আঙ্কেল হলাম!

আমি কি এতটাই বুড়ো?

আমি কি এতটাই নিরীহ?

আমি কি এতটাই প্রেম-অযোগ্য?

আমার অপরাধটা কী?

আমি তো শুধু একজন প্রেমিক হতে চেয়েছিলাম!

একজন, যে কারও জন্য অপেক্ষা করবে।

কেউ একজন, যার মেসেজ আসার অপেক্ষায় ফোনটা বারবার দেখবে।

কেউ একজন, যার সঙ্গে কথা বলার জন্য অকারণে রাত জাগবে।

কেউ একজন, যে রাগ করলে মন খারাপ করবে।

কেউ একজন, যার জন্য নিজের সবচেয়ে ভালো জামাটা পরবে।

কেউ একজন, যে বলবে—

‘তুমি আছো বলেই আমার পৃথিবীটা একটু সুন্দর।’

কিন্তু আমার জীবনে কেউ এল না।

কেউ আমাকে ভালোবাসল না।

কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করল না।

কেউ আমাকে প্রেমিক বানাল না।

অথচ আমি কতবার প্রেমিক হওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছি!

কতবার মনে মনে কথা সাজিয়েছি।

কতবার ভেবেছি—

আজ বলব।

আজ আর চুপ থাকব না।

কিন্তু প্রতিবারই আমার গল্পের শেষটা একই হয়েছে।

কখনো সে ছিল বড় অফিসারের মেয়ে।

কখনো ঝগড়া করে প্রেমের আগেই সম্পর্ক শেষ।

কখনো কলেজে মেয়ে কম।

কখনো পরিবার রাজি নয়।

কখনো সে অন্য কাউকে ভালোবাসে।

আর কখনো—

আমি হয়ে যাই কারও আঙ্কেল!

জীবনে বুঝি আর প্রেমিক হয়ে ওঠা হলো না।

আমার প্রেমহীন জীবনটা এখন শুকনো পাতার মতো।

হাওয়ায় উড়ে বেড়াচ্ছে।

কখনো কোনো পুরোনো বাসের কথা মনে পড়ে।

কখনো কোনো মেয়ের চোখ।

কখনো কোনো অসমাপ্ত বাক্য—

‘তোমাকে আমার…’

তারপর আর কিছু বলা হয়নি।

হয়তো কোনো দিন হবেও না।

তবু মাঝে মাঝে বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে—

আমি তো খুব বেশি কিছু চাইনি!

আমি তো শুধু একজন প্রেমিক হতে চেয়েছিলাম।

শুধু একজন।

যার জন্য কেউ অপেক্ষা করবে।

যে বলবে—

‘তুমি আজ আসোনি কেন?’

যে অভিমান করবে।

যে রাগ করবে।

যে আবার ফিরে আসবে।

কিন্তু আমার কপালে প্রেমিক হওয়া লেখা ছিল না।

আমার কপালে বুঝি লেখা ছিল—

‘ভালো ছেলে।’

‘ভালো মানুষ।’

“ভালো চাকরি।”

‘ভালো বেতন।’

শুধু—

‘প্রেমিক’ শব্দটা বাদ।

তাই আজও মাঝে মাঝে মনে হয়—

জীবনে আমার কোনো কিছুর অভাব নেই।

শুধু একজন মানুষ নেই,

যার কাছে গিয়ে বলতে পারি—

‘জানো, আমি সারা জীবন একজন প্রেমিক হতে চেয়েছিলাম।

কিন্তু কেউ আমাকে সেই সুযোগটাই দিল না।’

আর যদি কোনো দিন আমার জীবনের শেষ পাতাটা কেউ পড়ে,

তাহলে সে যেন অন্তত একবার বলে—

‘ইশ্‌!

ছেলেটা তো সত্যিই প্রেম করতে চেয়েছিল।

কিন্তু বেচারার কপালে প্রেমটাই ছিল না!’

About Editor Todaynews24

Check Also

প্রকৃতির প্রতি যত্ন- টেকসই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা

আমরা যদি প্রকৃতিকে রক্ষা না করি, তবে মানবজাতিসহ পৃথিবীর সকল জীবের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। তাই আমাদের বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে, পরিবেশ দূষণ কমাতে হবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে প্রকৃতি সংরক্ষণে সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *