
শ্রাবণের স্নিগ্ধ সকালে হালকা মেঘের আনাগোনা আর রোদের ঝলকানির মধ্যেই গত ৩০ জুলাই দুই ধাপে চট্টগ্রাম বন্ধুসভা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির কার্যক্রম সম্পন্ন করে।
‘বৃক্ষ শুধু রোপণ নয়, যত্ন নিয়ে বাঁচাতে হয়’ প্রতিপাদ্যে প্রথম ধাপে এদিন সকাল ৮টায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে উপস্থিত হন বন্ধুসভার সদস্যরা। সঙ্গে ছিল নানা প্রজাতির ফুল, ফল ও ঔষধি গুণসম্পন্ন চারা গাছ।

বৃক্ষরোপণের আগে স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজন করা হয় সেমিনার। এ সময় স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. নূর উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম বন্ধুসভার প্রতি কৃতজ্ঞতা। বিশ্বকে বাঁচাতে এ ধরনের সামাজিক কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে কালকের পৃথিবীটা সত্যিই আমাদের হবে।’
চট্টগ্রাম বন্ধুসভার সহসাংগঠনিক সম্পাদক জয় চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘আগে শহরাঞ্চলেও নানা ধরনের গাছের দেখা পাওয়া যেত। চারদিকে যে হারে গাছ নিধন করা হচ্ছে, অতিদ্রুত শহর থেকে গাছের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। তাই আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে, এবং সম্মিলিত পদক্ষেপের মাধ্যমে বেশি বেশি গাছ লাগানো প্রয়োজন। যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুন্দর করে বাঁচতে পারে।’

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী অথৈ সাহা অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলে, ‘ছোট থেকেই গাছের প্রতি আমার অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করে। দিনের বেশ খানিকটা সময় কেটে যায় গাছের পরিচর্যা করতে গিয়ে। এ নিয়ে বাসায় প্রচুর বকাঝকা শুনতে হয়। তবে আমি আমার পড়ালেখা ঠিক রাখার চেষ্টা করি। আজকে গাছ উপহার পেয়ে মনটাই ভালো হয়ে গেল।’
সেমিনার শেষে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মধ্যে চারা গাছ বিতরণ করা হয়। আম, কাঁঠাল, হরীতকী, নিম, টগর, তুলসী, ইনসুলিন, হাসনাহেনাসহ মোট ১২ প্রজাতির গাছ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের মধ্যে বিতরণ করেন বন্ধুরা। গাছের সঙ্গে বাংলা, ইংরেজি ও বৈজ্ঞানিক নাম এবং গাছের প্রকৃতিযুক্ত ‘প্ল্যান্ট আইডেন্টিফিকেশন লেভেল’ বাড়তি উদ্দীপনা যুক্ত করে। এতে করে শিক্ষার্থীরা প্রতিটি গাছকে আলাদা করে শনাক্ত করতে এবং গাছ সম্পর্কে জানতে পারবে। এরপরই বিদ্যালয় আঙিনায় বেশ কিছু গাছ রোপণ করা হয়।

বৃক্ষরোপণের দ্বিতীয় ধাপে একই দিন বিকেলবেলায় নগরীর জামালখান কুসুমকুমারী সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গাছ রোপণ এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে গাছের চারা বিতরণ করেন চট্টগ্রাম বন্ধুসভার বন্ধুরা।
শিক্ষার্থীদের কাছে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও গাছের তাৎপর্য তুলে ধরতে চমৎকার একটি সেশনের আয়োজন করা হয়। আলোচনায় স্কুলের প্রধান শিক্ষক লোকমান উদ্দীন বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্মের তরুণ সমাজ গাছ লাগানোর ব্যাপারে অনেকটাই উদাসীন। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই গাছের নাম জানে না। আজকের সেশন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নানা প্রজাতির গাছ সম্পর্কে নতুন করে জানবে, শিখবে এবং আগামীতে বেশি বেশি গাছ লাগানোর ব্যাপারে উৎসাহী হবে। নিজের স্বীয় কাজ যথার্থভাবে পালন করাই দেশপ্রেম। পড়ালেখার পাশাপাশি বৃক্ষরোপণের মতো সামাজিক কাজে অংশ নেওয়া নাগরিক দায়িত্ব।’

সহকারী শিক্ষক এ এন এম সোহাইলের বক্তব্যে গাছের গুরুত্ব ও বৃক্ষরোপণের সামাজিক প্রভাব ফুটে ওঠে। সিনিয়র শিক্ষিকা ফারহানা সুলতানা বলেন, ‘মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষায় নিজের যত্নের পাশাপাশি গাছের যত্নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।’
সবশেষে চট্টগ্রাম বন্ধুসভার সামাজিক, মানবিক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিকসহ যাবতীয় কার্যাবলি সম্পর্কে আলোকপাত করেন স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক ও চট্টগ্রাম বন্ধুসভার সভাপতি রুমিলা বড়ুয়া। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্ধুসভার সহসাংগঠনিক সম্পাদক জয় চক্রবর্তীর উপস্থাপনায় বাংলাদেশের বনভূমি, সুন্দরবন ও বিশ্বের ফুসফুস আমাজন বনের উদাহরণ ফুটে ওঠে।

সেমিনার শেষে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চারা গাছ বিতরণ করেন চট্টগ্রাম বন্ধুসভার সদস্য ও শিক্ষকেরা। চারা বিতরণ শেষ করে স্কুল প্রাঙ্গণে বেশকিছু গাছ রোপণ করা হয়। অবশিষ্ট গাছ শিক্ষার্থী এবং চট্টগ্রাম বন্ধুসভার বন্ধুদের উপহার হিসেবে দেওয়া হয়।
গাছ পেয়ে উচ্ছ্বসিত বন্ধুসভার বন্ধু প্রমি বড়ুয়া বলেন, ‘বেলি ফুলের গাছ আমার অনেক প্রিয়। আজকে বাসার ব্যালকনিতে লাগিয়ে দেব এটি। কৃতজ্ঞতা চট্টগ্রাম বন্ধুসভার প্রতি।’

দপ্তর সম্পাদক সাকিব জিসান বহেরাগাছ পেয়ে বলেন, ‘এটি ভেষজ গাছ, ঔষধি গুণসম্পন্ন। নিয়মিত পরিচর্যা করব এই গাছের। স্কুলশিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি নিজের জন্যও গাছ নিয়েছি।’
সব মিলিয়ে নয় শতাধিক গাছ রোপণ ও বিতরণ করে চট্টগ্রাম বন্ধুসভা। এই কার্যক্রমের সমন্বয়কারী হিসেবে ছিলেন পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক শান্ত বড়ুয়া, ত্রাণ ও দুর্যোগ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন ও কার্যনির্বাহী সদস্য মারুফ উল হক। এ ছাড়া কার্যক্রমে আরও অংশগ্রহণ করেন বইমেলা সম্পাদক সামিয়া সুলতানা, কার্যনির্বাহী সদস্য তাজরিয়া রশিদ, বন্ধু অতন্দ্রিলা রিয়া, নিলয় বিশ্বাস ও শ্রদ্ধানিধি ভিক্ষুসহ অনেকেই।
পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা