বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে পাঠচক্রের আসর করেছে দিনাজপুর বন্ধুসভা। ২২ জুলাই এটি অনুষ্ঠিত হয়।
‘পথের পাঁচালী’ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমর লেখা। বাংলার অজপাড়াগাঁয়ে অভাব–অনটনের সংসারে বেড়ে ওঠা দুই ভাই–বোন অপু ও দুর্গা। মা সর্বজয়া, বাবা হরিহর এবং বৃদ্ধা পিসি ইন্দির ঠাকরুণকে নিয়েই তাদের সংসার। উপন্যাসকে লেখক তিনটি পর্বে ভাগ করেছেন—বল্লালী বল্লাই, আম আঁটির ভেঁপু ও অক্রুর সংবাদ।
সভাপতি শবনম মুস্তারিন বন্ধুদের উদ্দেশে ‘বল্লালী বল্লাই’ পর্বের প্রতিটি শব্দ ও অন্তর্নিহিত কথা বিশ্লেষণ করে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘প্রাচীনকালে প্রচলিত ছিল কৌলিন্য প্রথা, যেখানে নামজাদা নৈকষ্য কুলীনেরা পুরুষ বিবাহ করতে পারতেন। পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর, এমনকি শতাধিক স্ত্রীর কুলীন স্বামীর কথাও শোনা যায়। তখন নারীদের জীবন ছিল বড্ড বেদনাদায়ক। তার অন্যতম উদাহরণ হলো “পথের পাঁচালী”র ইন্দির ঠাকরুণ। কৌলিন্য প্রথার শিকার তিনি। হয়তো তার জীবনের মতো ট্র্যাজেডি আর কারও নেই। পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তার মতো দুর্দশা আর কেউ দেখেনি। ইন্দির ঠাকরুণের জীবনকে গভীরভাবে দেখলে চোখের কোনায় অশ্রু চলে আসে।’

‘আম আঁটির ভেঁপু’ নিয়ে বিস্তারিত বলেন সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, ‘পথের পাঁচালী’র মধ্যে একটা পথ আছে। সেই পথটা নিশ্চিন্দপুরে। একদম নিশ্চিত একটা পথ। হয়তো সেখানে কোনো দুশ্চিন্তা, দোটানা নেই। আছে কেবল অজস্র সুখ আর আনন্দ। সত্যি বলতে শৈশবে তো আর কোনো চিন্তা, দোটানা থাকে না। থাকে শুধু নতুন কিছু আবিষ্কার করার আকাঙ্ক্ষা। পৃথিবীকে জানার অসম্ভব আগ্রহ।
‘এই যে অপু-দুর্গার পরিবার ঠিকভাবে তাদের আবদার মেটাতে পারে না। কিন্তু এ নিয়ে তাদের যেন একটুও মাথাব্যথা নেই। তবে “পথের পাঁচালী”র সেই পথটা কোথায় আছে, জানো? সেই পথটা হলো যখন দুর্গা অপুকে একা রেখে অচেনা পথে পাড়ি জমায়। এমন এক পথ, যেখানে থেকে আর কোনো দিন যার ছোট ভাই অপুর কাছে ফিরতে পারবে না। একা পৃথিবীতে অপুকে বেঁচে থাকতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে।’

পাঠচক্রটি অনুষ্ঠিত হয় একটি চায়ের টংদোকানে। বসে ছিলেন বন্ধুরা সবাই। হাতে ছিল এক কাপ গরম চা। সেই গরম চা যেন এক নিমেষেই ঠান্ডা হয়ে গেল। চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার কথা হয়তো সবাই ভুলে গিয়েছিলেন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যেভাবে ‘পথের পাঁচালী’র অন্তর্নিহিত কাহিনি বিশ্লেষণ করে শুনিয়েছেন, সবার ভেতরে যেন এক অজানা দুঃখের বাতাস বয়ে গেল। সবাই হয়তো উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে জীবন মাঝেমধ্যে কতটা ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়।
দোকানের পাশেই ছিল ছোট্ট একটা খেলার মাঠ। সেখানে কয়েকটা শিশু খেলাধুলা করছিল। বন্ধুরা মাঠের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। পিচ্চিগুলো যেন গল্প শোনার অপেক্ষায় ছিল। তারা কাছে এসে বসল। বন্ধুরা তাদের গল্পের বই পড়ে শোনালেন। সেখানে ছিল ছোট্ট আবদুল্লাহ। সে বলল, ‘যখন বড় হব, তখন আমিও গল্পের বই পড়ব।’
পাঠচক্রে আরও উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিন নাওয়াজ, বন্ধু মারুফ হাসান, নাফিসা জান্নাত, সানজিদা শীলা, জান্নাতে রাইয়ান, সুমাইয়া আক্তার, সজীব রায়সহ অন্যরা।
সাংগঠনিক সম্পাদক, দিনাজপুর বন্ধুসভা