আমার নাম শফিক। বয়স ৩৩। এই দুটি তথ্য আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি। এর বাইরে আমার জীবনের কোনো তথ্যই নিশ্চিত না। বারবার বদলাতে থাকে। কারণটা ভেঙে বলি। আমার জীবন একটি না, দুটি।
প্রতি রাতে আমি যখন ঘুমাতে যাই, তখন আসলে আমি ঘুমাই না। আমি জেগে উঠি অন্য একটা জায়গায়, অন্য একটা জীবনে। সেখানে সারা দিন কাটাই, রাতে সেখানে ঘুমাতে যাই এবং এখানে জেগে উঠি। ঘুম নামের জিনিসটা আমার জীবনে নেই। আছে শুধু একটা দরজা। প্রতি রাতে আমি সেই দরজা দিয়ে এক জীবন থেকে আরেক জীবনে ঢুকে পড়ি।
আমার ঘুম ভাঙার একটা নিজস্ব কায়দা আছে। চোখ খোলার আগে আমি বাঁ হাতটা তুলে আঙুলগুলো নাড়ি। পরীক্ষা করে দেখি হাতটা কার। তারপর চোখ খুলে সবার আগে ছাদ দেখি। ছাদই আমার দুই জগতের কম্পাস। শীতল এসি করা রুম, কংক্রিটের ছাদ আর জানালার বড় ধূসর পর্দা মানে আমি ঢাকায়।
মাথার ওপর টিনের চাল আর দূরে ফজরের আজান মানে আমি সিলেটের কদমতলী গ্রামে। তারপর বালিশের নিচ থেকে ডায়েরি বের করে তারিখে টিক দিই। ঢাকার ডায়েরিটা নীল, কদমতলীরটা লাল। দুই জীবনের হিসাব দুই খাতায়, যাতে গুলিয়ে না যায়। ১৩ বছরে আমি এক দিনও টিক দিতে ভুলিনি। যে মানুষের জীবন দুটো, হিসাব রাখাই তার একমাত্র ধর্ম। আমার দুই জীবনের পেশাও হিসাব আর গাণিতিক বিদ্যার মধ্যেই।
প্রথম জীবনে আমি ঢাকার একটা ব্যাংকে চাকরি করি। সিনিয়র কাস্টমার ম্যানেজার। বসে বসে সারা দিন অন্যের টাকা গুনি। আমার স্ত্রীর নাম লুনা। অসম্ভব অভিমানী মেয়ে। লুনার জীবন আর জল্পনা–কল্পনা তার এই ছোট্ট সংসার ঘিরেই। আমাদের মেয়ে আরিয়া, বয়স ৭। আমরা বাসায় ওকে টুনটুনি বলে ডাকি। তার ধারণা, তার বাবা পৃথিবীর সবচেয়ে বড়লোক মানুষ। কারণ, সে একবার মায়ের সঙ্গে ব্যাংকে গিয়ে দেখেছিল মানুষের সব টাকা তার বাবার কাছেই থাকে। এ ছাড়া আমি বেশ ভালো কবিতা লিখি। বইমেলায় আমার দুইটা বেশ আলোচিত বইও বের হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার মোটামুটি বেশ কিছু ভক্ত রয়েছে।
দ্বিতীয় জীবন একেবারেই ভিন্ন, আমি থাকি সিলেটের এক গ্রামে। হাওরের কিনারে ছোট্ট গ্রাম, নাম কদমতলী। সেখানে আমি স্কুলমাস্টার, অঙ্ক পড়াই। চারদিকে সবুজের ঢেউ, বর্ষায় হাওর ফুলে সমুদ্র হয়ে যায়। আর আকাশ ভেঙে এমন বৃষ্টি নামে যে মনে হয় ওপরওয়ালা পৃথিবীটা ধুয়ে নতুন করে বানাতে চান।
সেই জীবনে আমার মা বেঁচে আছেন।
ঢাকার জীবনে মা মারা গেছেন আমার ১১ বছর বয়সে। কিন্তু কদমতলীর জীবনে মা আছেন। উঠানে বসে পান–সুপারি কাটেন, আমার জন্য ভাত বেড়ে অপেক্ষা করেন, আর ভাত কম খেলে এমনভাবে তাকান যেন আমি রাষ্ট্রীয় অপরাধ করেছি। গ্রামে বেশ একাকী জীবন কাটাই। কিছু কৃষিকাজও করি হাওরের পাশেই বাবার রেখে যাওয়া জমিতে। মাঝেমধ্যে নৌকা নিয়ে হাওরে ঘুরি। স্কুলের ছাত্রদের সঙ্গে ফুটবল খেলি।
পৃথিবীর তাবৎ মানুষ দিন শেষে ঘুমাতে যায় ক্লান্তি নিয়ে। আমি ঘুমাতে যাই নভোচারীর মতো। কারণ, ঘুমালেই আমার অদৃশ্য রকেট চলা শুরু করবে, জগৎ বদলে যাবে।
মানুষ ভাবে সে এক জীবনে বাঁচে। হয়তো ভুল ভাবে। যে জীবনটা সে পায়নি, সেটাও ছায়ার মতো তার পাশে পাশে হাঁটে। আমার শুধু ছায়াটা একটু বেশি স্পষ্ট, এই যা।
আমার নিয়ম তিনটা। এক. ঘুম ভেঙে আগে ছাদ দেখা। দুই. দুই জীবনের দুই ডায়েরিতে তারিখের হিসাব রাখা। তিন. কাউকে কিছু না বলা।
তিন নম্বর নিয়মটাই সবচেয়ে কঠিন। যে মানুষ দুই জীবনে বাঁচে, তার প্রতিটা কথার ফাঁক দিয়ে অন্য জীবনটা উঁকি মারতে চায়। একদিন ভাত খেতে খেতে টুনটুনিকে বলে ফেললাম, ‘ভাত খা। মতিনের মতো ফাঁকিবাজি করবি না।’
সেই রাতে আমি বুঝলাম, ভয়ংকর কিছু ঘটে গেছে। দুটি জগৎ আলাদা থাকার কথা। দেয়ালে ফাটল ধরেছে। এক জগতের জল আরেক জগতে চুইয়ে পড়ছে।
ঢাকায় জেগে দেখি টুনটুনি জ্বরে পুড়ছে। ঘোরের মধ্যে সে বলছে, ‘বাবা, টিনের চালে এত বৃষ্টির শব্দ কেন? আমি ঘুমাতে পারছি না।’
টুনটুনি ভাতমাখা হাত থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘মতিন কে বাবা?’
মতিন আমার ছাত্র। রোল ৭। তার ব্রেন ভালো, কিন্তু অনেক ফাঁকিবাজ। যে জগতে মতিন আছে, সে জগতে টুনটুনি নেই। আমি ঢোঁক গিলে বললাম, ‘অফিসের একজন। ভাত খাও মা।’
লুনা ভুরু তুলে তাকাল। আমি মাথা নিচু করে ভাত খেতে থাকলাম।
একবার সাহস করে ঢাকায় এক সাইকিয়াট্রিস্ট দেখিয়েছিলাম। তিনি সব শুনে চশমা খুলে মুছতে মুছতে বললেন, ‘আপনি অত্যন্ত সুসংগঠিত স্বপ্ন দেখেন। একে বলে লুসিড ড্রিমিং।’
আমি বললাম, ‘স্যার, স্বপ্নে কি মানুষ অঙ্কের খাতা দেখে? আমি প্রতিদিন চল্লিশটা খাতা দেখি। ছাত্রদের নাম আর রোল নম্বর সব মুখস্থ বলতে পারি।’
তিনি হাসলেন। বললেন, ‘মস্তিষ্ক বড় বিচিত্র জিনিস। নিয়মিত নামাজ পড়েন। পরিবারকে সময় দিন। আরও বাচ্চাকাচ্চা নিন।’
মজার ব্যাপার, কদমতলীর জীবনেও আমি সিলেট শহরে এক ডাক্তার দেখিয়েছিলাম। তিনিও চশমা খুলে মুছলেন, হুবহু একই ভঙ্গিতে এবং বললেন, ‘মস্তিষ্ক বড় বিচিত্র জিনিস।’
দুই জগতের দুই ডাক্তার, সংলাপ এক। আমার তখন প্রথম সন্দেহ হলো, এই দুই জগতের লেখক সম্ভবত একজনই। এবং অলস লেখক, তিনি সংলাপের পুনরাবৃত্তি করেন।
অদ্ভুত ঘটনা যে আরও ঘটত না, তা নয়। যেমন কদমতলীর বাজারে বটগাছের নিচে এক অন্ধ ফকির বসে দোতারা বাজায় আর গাঁজা টানে। একদিন পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে গান থামিয়ে বলল, ‘ও মাস্টার। আইজ রাইতে কোন বাড়িত ঘুমাইবা?’
আমি থমকে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘মানে?’
ফকির হেসে আবার দোতারায় সুর তুলল।
তারপর গাইতে গাইতে বলল, ‘কিছু না রে পাগল মন। মানুষ তো রোজ রাইতে দুই বাড়িত ঘুমায়। এক বাড়ি মাটির, আরেক বাড়ি খোয়াবের। কোনটা কোনটা, খালি জানে উপরওয়ালায় রে…’
কিংবা যেমন আমার দুই জীবনের দুই ঘরে দুটি দেয়ালঘড়ি আছে। আর দুটিই বন্ধ হয়ে আছে ঠিক তিনটা তেত্রিশ মিনিটে। আমি ঘড়ি দুটি ঠিক করাই না। কিছু জিনিসকে ঘাঁটতে নেই।
আমি শিখে গিয়েছিলাম এসব না দেখার ভান করতে। ভান করাটাই মানিয়ে নেওয়া। মানুষ সবকিছুতেই মানিয়ে নেয়। এটাই মানুষের ক্ষমতা, এটাই মানুষের ট্র্যাজেডি।
১৩ বছর এভাবেই চলেছে। তারপর এল সেই বৃহস্পতিবার।
কদমতলীর স্কুলে সেদিন নতুন শিক্ষিকা যোগ দিলেন। হেডস্যার পরিচয় করাতে গিয়ে বললেন, ‘ইনি বাংলা পড়াবেন। ঢাকা থেকে এসেছেন। নাম…’
আমি বললাম, ‘লুনা।’
হেডস্যার অবাক হয়ে বললেন, ‘আপনি চেনেন নাকি?’
ভদ্রমহিলা আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ঢাকার লুনার মুখ। ভুরুর পাশে সেই তিল। শুধু চোখের নিচে একধরনের ক্লান্তি, যে ক্লান্তি একা মানুষদের হয়। তিনি প্রায় ফিসফিস করে বললেন, ‘আমিও ওনাকে চিনি। উনি প্রতি রাতে আমার স্বপ্নে আসেন। স্বপ্নে আমাদের একটা মেয়ে আছে। ফ্রক পরা, সামনের দুই দাঁত নেই। তার নাম…’
আমি বললাম, ‘টুনটুনি।’
স্কুল ছুটির পর হাওরের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে লুনা বললেন, ‘তেইশ বছর বয়স থেকে ওই বাচ্চাটাকে স্বপ্নে দেখি। প্রতি রাতে সে আমাকে মা ডাকে। আমি ওকে বুকে জড়িয়ে রাখি। সকালে উঠে দেখি হাত খালি, ঘর খালি। লোকে জিজ্ঞেস করে, বিয়ে করি না কেন। কী বলব বলেন? বলব যে আমার সংসার আছে, রাতের বেলার স্বপ্নের সংসার?’
হাওরের শান্ত পানির দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বললেন, ‘মাস্টার সাহেব, আমাদের সত্যি জগৎ কোনটা?’
আমি উত্তর দিতে পারিনি। পৃথিবীর কঠিনতম প্রশ্নগুলো কিছু মানুষ কীভাবে এত নরম গলায় করে?
সেই রাতে আমি বুঝলাম, ভয়ংকর কিছু ঘটে গেছে। দুটি জগৎ আলাদা থাকার কথা। দেয়ালে ফাটল ধরেছে। এক জগতের জল আরেক জগতে চুইয়ে পড়ছে।
ঢাকায় জেগে দেখি টুনটুনি জ্বরে পুড়ছে। ঘোরের মধ্যে সে বলছে, ‘বাবা, টিনের চালে এত বৃষ্টির শব্দ কেন? আমি ঘুমাতে পারছি না।’
আমি চমকে উঠে বললাম, ‘মা, তুমি কি জানো?’ মা হাসলেন। বললেন, ‘মায়েরা সব জানে। খালি না জানার ভান কইরা থাকে, যাতে পোলাপান শান্তি পায়।’ আগুন কাঁপছিল। মা খুব আস্তে বললেন, ‘যাওয়ার আগে খালি একবার আমার সামনে বইসা পেট ভইরা কই মাছ দিয়া ভাত খা।’
আমাদের ঢাকার বাসার ছাদ কংক্রিটের। ঢাকায় সেদিন বৃষ্টি ছিল না। বৃষ্টি ছিল কদমতলীতে।
পরের সাত দিনে ফাটল বাড়তে লাগল। ব্যাংকে টাকা গুনতে গিয়ে দেখি একটা পাঁচ শ টাকার নোটের কোনায় পেনসিলে কষা অঙ্ক, নিচে শিশুর হাতে লেখা, মতিন, রোল ৭।
আবার কদমতলীর ক্লাসরুমে ঢুকে দেখি ব্ল্যাকবোর্ডে কাঁচা হাতের লেখা, ‘বাবা, তাড়াতাড়ি বাসায় এসো।’ এক ভোরে ঢাকার বাসার বারান্দায় চা খেতে খেতে হঠাৎ পেলাম পানের গন্ধ। মনে হলো আমার কদমতলীর মা আশপাশেই।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা দিল টুনটুনি। ষষ্ঠ রাতে সে ঘুম থেকে উঠে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘বাবা, একটা বুড়ি দাদু রোজ রাতে আমাকে ঘুমপাড়ানি গান শোনায়। দাদুর গায়ে পানের গন্ধ। দাদু বলেছে তোমাকে ভাত বেশি করে খেতে।’
আমার এই জগতের মা মারা গেছেন টুনটুনির জন্মের ২২ বছর আগে। আমার মেয়ে জীবনে পানের গন্ধ শোঁকেনি, গ্রামেও যায়নি।
অষ্টম রাতে আমি জীবনে প্রথমবার স্বপ্ন দেখলাম। ধবধবে সাদা একটা ঘর। মাঝখানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দুই জগতের দুই ডাক্তার। দুজনের চেহারা একই, একজন চশমা পরা, একজন চশমাহীন। তারা একসঙ্গে, একই স্বরে বললেন, ‘শফিক সাহেব, একটা এরর হয়েছে। গ্রেভ ইরর। মানুষের ভুল হওয়া মানা যায়। কারণ, মানুষকে বানানোই হয়েছে ভুল করা আর ভুলের মাশুল দেওয়ার জন্য। কিন্তু এ ধরনের মহাজাগতিক ভুল কীভাবে হলো বলেন তো? একই চেতনা ভুল করে দুটো সিম্যুলেশনে ঢুকে গেছে। এত দিন সমস্যা হয়নি, কারণ কেউ জানেনি বা বিশ্বাস করেনি। তাই এরর ধরাও পড়েনি। এখন লুনা নামের সুন্দরী মেয়েটি অন্তত একটা জগতে বিশ্বাস করেছে, ফুটফুটে বাচ্চা টুনটুনিও বিশ্বাস করেছে। দুটো জগৎ একে অপরকে চিনে ফেলেছে। এভাবে চললে দুটোই ভেঙে পড়বে। একটা জগৎ মুছে ফেলতে হবে। এত বড় এরর আমাদের মহান প্রোগ্রামার অ্যালাউ করবেন না। দেখা যাবে গোড়া থেকে সব ডিলিট। আপনাকে অতি দ্রুত যেকোনো একটা জগৎ স্থায়ীভাবে বেছে নিতে হবে।’
‘কোনটা?’
‘সেটা আপনি ঠিক করবেন। আজ রাতে একবার করে দুই জগতেই যাবেন, এরপরে যেটা মুছে ফেলতে চাইবেন, সেটা মুছে যাবে। যেখানে জেগে উঠবেন, সেটা থাকবে। এই শেষবার। ভেবে ঘুমাবেন। একবার ঘুমিয়ে পড়লেই খেল খতম। তাই ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেবেন।’
আমি বললাম, ‘যে জগৎটা মুছে যাবে, তার মানুষগুলোর কী হবে?’
দুই ডাক্তার একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘মুছে যাওয়া ব্যথাহীন। ব্যথা শুধু তার, যে মনে রাখে।’
‘তার মানে ব্যথাটা শুধু আমার।’
‘জি। যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে, ব্যথা শুধু তার।’
শেষ দিনটা আমি দুই জগতে দুইভাবে কাটালাম।
কদমতলীতে সন্ধ্যাবেলা মা উঠানে মাটির চুলায় কই মাছ ভাজছিলেন। আমি পাশে বসলাম। মা হঠাৎ বললেন, ‘তোর কী হইছে, ক তো বাবা। তুই আমার দিকে এমনে চাইয়া আছস, যেমনে মানুষ শেষবারের মতো চায়।’
আমি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, ‘মা, ধরো এমন যদি হতো, তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না। তুমি কী করতে?’
মা মাছ উল্টাতে উল্টাতে খুব সহজ গলায় বললেন, ‘কিছুই করতাম না। এই একটা ক্ষণিকের জীবন, এরপরে আরও বড় জীবন আছে তো বাবা।’
তারপর আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন, ‘আর শোন। আমার লাইগা পইড়া থাকিস না। মরা মানুষের টানে জ্যান্ত মানুষ আটকাইতে নাই। তোর যেইখানে সংসার, যেইখানে তোর মাইয়া, তুই সেইখানে যা।’
আমি চমকে উঠে বললাম, ‘মা, তুমি কি জানো?’
মা হাসলেন। বললেন, ‘মায়েরা সব জানে। খালি না জানার ভান কইরা থাকে, যাতে পোলাপান শান্তি পায়।’
আগুন কাঁপছিল। মা খুব আস্তে বললেন, ‘যাওয়ার আগে খালি একবার আমার সামনে বইসা পেট ভইরা কই মাছ দিয়া ভাত খা।’
আমি সাড়া দিই না। সাড়া না দেওয়ার কারণ ভয়। তবে যে ভয়টা আপনি ভাবছেন, সেটা না। আমার ভয় হলো, দরজা খুললে আমি জানতে পারব ওপাশে কে দাঁড়িয়ে। যাদের আমি মুছে দিয়েছি তারা, নাকি যে আমাকে মুছে দিয়েছে সে?
হাওরের পাড়ে লুনা দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে দেখে বলল, ‘আপনি চলে যাবেন। আমি জানি। এটাও জানি কোথায় যাবেন। ঠিকই আছে। আমি তো ওই জগতেও আছি। ওই আমিটা ভাগ্যবতী, এই আমিটা না। এ–ই যা তফাত। ওকে বলবেন, তার কপালে যে সংসারটা জুটেছে, সেটার জন্য অন্য এক জগতে একজন সারা জীবন অপেক্ষা করে বসে আছে। সে যেন জীবনটা কোনোভাবেই অবহেলা না করে।’
তারপর গলা নামিয়ে বলল, ‘যাওয়ার আগে একটা মিথ্যা বলে যান। বলেন যে এই জগতেই থাকবেন।’
আমি বললাম, ‘থাকব।’
লুনা হাসল। পূর্ণ, উজ্জ্বল হাসি।
ঢাকায় সেই রাতে টুনটুনির জ্বর কমেছে। সে আমার হাত ধরে শুয়ে ছিল। ভোর চারটার দিকে ঘুম ভেঙে বলল, ‘বাবা, তুমি ঘুমাও না কেন?’
‘ঘুমালে একটা জিনিস হারিয়ে যাবে মা।’
সে ঘুমজড়ানো গলায় বলল, ‘ঘুমিয়ে ওঠার পর যেটা হারিয়ে যায়, সেটা স্বপ্ন। স্কুলের মিস বলেছেন। স্বপ্ন হারালে তো সমস্যা নেই। ঘুমাও বাবা।’
সাত বছরের মেয়ের কাছে আমি দর্শনের পাঠ নিলাম। এক পাশে আমার মেয়ে, আমার স্ত্রী; আরেক পাশে আমার মা, আর সেই মানুষটা, যে সবে আমাকে খুঁজে পেয়েছে। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে অনেক পরীক্ষা দেন। সবচেয়ে বড় পরীক্ষার নাম বিকল্প ভাবনা, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া, কোনটা করলে কী হতো আর কী হতে পারত, এই নিয়ে দোটানা।
আমি জেগে উঠলাম।
অভ্যাসমতো চোখ খোলার আগে বাঁ হাত তুললাম, আঙুল নাড়লাম। তারপর চোখ খুলে ছাদ দেখলাম।
কোন ছাদটা দেখলাম, তা বলব না। বললে গল্পটা শেষ হয়ে যাবে। কিছু গল্প শেষ করতে নেই।
শুধু এটুকু বলতে পারি, ঘুম ভেঙে প্রথম যে জিনিসটা টের পেলাম, তা হলো শূন্যতা। কিছু একটা নেই। কী নেই, মনে করতে পারলাম না। মুছে যাওয়া জগতের স্মৃতিও কি ধীরে ধীরে মুছে যায়? ডাক্তাররা এই কথাটা বলেননি।
বালিশের নিচে ডায়েরিটা ছিল। কী রঙের ডায়েরি, সেটাও বলব না। ডায়েরির শেষ পাতায় ১৩ বছরের হিসাব আর লেখালেখি। আমি সেদিন থেকে ডায়েরিতে কোনো লেখালেখি বন্ধ করে দিয়েছি।
এরপর বহু বছর কেটে গেছে। আমার জীবন এখন একটাই। সবার মতো। রাতে ঘুমাই। স্বপ্ন দেখি না। সকালে উঠি। লোকে বলে আমি সুখী মানুষ। কথাটা সম্ভবত সত্যি। শুধু মাঝেমধ্যে অকারণে বুকের ভেতরটা খালি লাগে। আমি ভেবে পাই না কেন। আমার তো সবই আছে।
পরে বুঝেছি, এই খালি ভাবটা শুধু আমার না। প্রত্যেকেরই হয়তো বুকের ভেতরে কিছু তালা দেওয়া খালি ঘর থাকে। ঘরগুলো কিসের জন্য খালি পড়ে আছে, মানুষ নিজেও জানে না। হয়তো প্রত্যেকেরই কোথাও না কোথাও একটা মুছে যাওয়া জগৎ আছে। একটা না–বলা ‘মা’ ডাক, একটা না–হওয়া সংসার, একটা না–ধরা হাত, একটা অসমাপ্ত গল্প। কিছু হারালে মানুষ কাঁদে। কিন্তু কী হারিয়েছে ভুলে গেলে মানুষ কাঁদতেও পারে না। শুধু শূন্য হয়ে থাকে। কান্নার চেয়ে শূন্যতা অনেক ভারী।
তবে তিনটা ঘটনা আছে, যার ব্যাখ্যা আমি আজও পাইনি।
প্রথম ঘটনা। খুব বৃষ্টির রাতে আমি এমন একটা ছাদের শব্দ শুনি, যে ছাদ আমার বাড়িতে নেই। কোন ছাদের শব্দ, সেটা বললেই আপনি বুঝে ফেলবেন আমি কোন জগতে জেগেছিলাম। তাই বলব না। প্রথম প্রথম ভাবতাম শব্দটা আমার কানের ভুল। ভুলটা ভাঙল এক রাতে, যখন আমার পাশে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটা আধো ঘুমে বিড়বিড় করে বলল, ‘আজ বৃষ্টির শব্দটা কেমন অন্য রকম লাগছে, না?’
দ্বিতীয় ঘটনা। বছরে একটা দিন আছে, যেদিন আমার ঘুম ভাঙে সেই শূন্যতার গ্রাসের মধ্যে। স্বপ্ন না, দুঃস্বপ্ন না, কিছুই না। শুধু ঘুম ভেঙে টের পাই বুকের ভেতর পাথর, আর বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে খুব চেনা একটা গন্ধ। আমি ক্যালেন্ডার দেখেছি, পুরোনো ডায়েরি ঘেঁটেছি। এই তারিখে আমার জীবনে কোনো দিন কিছু ঘটেনি। কারও জন্ম না, কারও মৃত্যু না, কিছুই না। আমার মনে পড়ে না কেন এই রাতটা এমন।
তৃতীয় ঘটনা এবং এটাই সবচেয়ে অদ্ভুত। প্রায় রাতেই চোখ বন্ধ করার ঠিক পরে মনে হয়, জগৎ বদলানোর দরজাটা এখনো আছে। মুছে যায়নি। আমি কেবল ভুলে গেছি ওটা কীভাবে খুলতে হয়। কোনো কোনো রাতে ওপাশ থেকে টোকা পড়ে। মৃদু, ধৈর্যশীল টোকা। বছরের পর বছর ধরে আমি একটা জিনিস লক্ষ করেছি। টোকাটা কখনো দুঃখের রাতে পড়ে না। পড়ে সুখের রাতে, যে রাতে আমি প্রাণ খুলে হেসেছি, যে রাতে খেতে বসে মনে হয়েছে জীবনটা আসলে সুন্দর, ঠিক সেই রাতেই ওপাশ থেকে কেউ দরজায় টোকা দেয়। যেন মনে করিয়ে দিতে চায়, এই হাসিটার দাম কেউ একজন দিয়ে গেছে। কিংবা কে জানে, হয়তো ওপাশের মানুষগুলো টের পায় যে আমি তাদের ভুলে যাচ্ছি। ডাক্তাররা বলেছিলেন, মুছে যাওয়া ব্যথাহীন, ব্যথা শুধু তার যে মনে রাখে। এই কথাটা আমি আজকাল আর বিশ্বাস করি না।
আমি সাড়া দিই না।
সাড়া না দেওয়ার কারণ ভয়। তবে যে ভয়টা আপনি ভাবছেন, সেটা না। আমার ভয় হলো, দরজা খুললে আমি জানতে পারব ওপাশে কে দাঁড়িয়ে।
যাদের আমি মুছে দিয়েছি তারা, নাকি যে আমাকে মুছে দিয়েছে সে?