চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পাকিস্তান থেকে দেশে পণ্য আমদানি বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি। একই সময়ে ভারত থেকে পণ্য আমদানি কমেছে প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে বাংলাদেশের। একই সঙ্গে সম্পর্কে কিছুটা শীতল ভাব দেখা যাচ্ছে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে। এরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দুই দেশ থেকে পণ্য আমদানির পরিসংখ্যানে।
একই সময় কিছুটা হ্রাস পেয়েছে ভারত থেকে পণ্য আমদানি। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ভারত থেকে পণ্য আমদানি হয়েছে ২ হাজার ৫২ দশমিক ১ মিলিয়ন (২০৫ কোটি ২১ লাখ) ডলারের। যদিও আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৬৭ দশমিক ২ মিলিয়ন (২২৬ কোটি ৭২ লাখ) ডলারের। সে অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তুলনায় আমদানি কমেছে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয় মূলত পোশাক শিল্পের কাঁচামাল ও রাসায়নিক, কাচশিল্পের কাঁচামাল ভাঙা কাচ, প্লাস্টিক ও রাবার শিল্পের কাঁচামাল, খনিজ পদার্থ ও পেঁয়াজ-আলুসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে পাকিস্তান থেকে দেশে পণ্য আমদানি হয়েছে ১৭৯ দশমিক ৪ মিলিয়ন (১৭ কোটি ৯৪ লাখ) ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ে দেশটি থেকে পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল ১৪১ মিলিয়ন (১৪ কোটি ১০ লাখ) ডলারের। এ হিসাব অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে এক প্রান্তিকে পাকিস্তান থেকে পণ্য আমদানি বেড়েছে ২৭ দশমিক ২৩ শতাংশ।
তবে এখনো দেশে পণ্য আমদানির দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস ভারত। চীনের পরই দেশটি থেকে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ পরিমাণে পণ্য আমদানি করে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও দেশের শীর্ষ ২০ আমদানির উৎস দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। তখন ভারত থেকে ৯ বিলিয়ন (৯০০ কোটি) ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছিল, যা মোট আমদানির ১৪ শতাংশের বেশি। আর সর্বোচ্চ পণ্য আমদানি হয়েছিল চীন থেকে, যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
এটি ছিল মোট আমদানির ২৬ শতাংশের বেশি। গত অর্থবছরে আমদানি পণ্যের উৎস হিসেবে পাকিস্তানের অবস্থান ছিল তালিকার ২০তম। দেশটি থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৬২৭ মিলিয়ন (৬২ কোটি ৭০ লাখ) ডলার। মোট আমদানিতে দেশটির অবদান ছিল মাত্র ১ শতাংশ। তবে সম্প্রতি পাকিস্তান থেকে সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল শুরু করায় দেশটি থেকে আমদানির পরিমাণ বাড়ছে।
পাকিস্তান থেকে বাণিজ্য আগেও বাড়তে পারত বলে মনে করছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের অনেক রফতানি করার মতো সুবিধাজনক পণ্য রয়েছে। তবে এতদিন তা আসতে পারেনি, এখন আসছে। দুই দেশের মধ্যে ভিসা বন্ধ থাকায় হয়তো ভারত থেকে আমদানি কমেছে। আর এখন পাকিস্তান থেকে বাড়লেও পরিমাণের দিক থেকে ভারত থেকেই আমদানি বেশি থাকবে। আর ভবিষ্যতেও বাণিজ্যিক সম্পর্কগুলোর মূল নিয়ামক থাকবে চাহিদা ও সরবরাহ।’
ব্যবসায়ী নেতারা অবশ্য বলছেন, ভারত থেকে আমদানি কমাটা রাজনৈতিক কারণের চেয়ে বিনিয়োগ পরিবেশের সঙ্গে বেশি সম্পর্কযুক্ত। এ বিষয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভারত থেকে মূলত যন্ত্রপাতি এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি হয় বেশি। কিন্তু সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নতি না হওয়ায় আমদানি কিছুটা কমেছে।
তবে এখনো ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের একটি বড় অংশ আসে ভারত থেকে। তাই এখানে কোনো সরবরাহ সংকট হলে বড় সমস্যা তৈরি হবে। কিন্তু পাকিস্তান থেকে মূলত তুলা ছাড়া তেমন কোনো পণ্য আমদানি হয় না। আবার পাকিস্তানে আমাদের কোনো রফতানিও নেই। দেশটির বাজার ছোট হওয়ায় এবং রফতানির জন্য কোনো প্রচারণা না থাকায় এমনটা হয়েছে।’
পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সখ্যও এখন আগের চেয়ে বেড়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে কূটনৈতিক পর্যায়ে এ তৎপরতা চোখে পড়ছে। দেশটির ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত এখন নিয়মিত ব্যবসায়ী সংগঠন এবং রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। এর প্রভাবে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানের করাচি বন্দরের সঙ্গে চট্টগ্রামের সরাসরি কনটেইনার জাহাজ যোগাযোগ চালু হয়েছে।
ওই সময় ‘এমভি ইউয়ান জিয়ান ফা ঝং’ নামের একটি জাহাজ পাকিস্তানের করাচি বন্দর থেকে জাহাজে করে সরাসরি কনটেইনারে পণ্য আনে চট্টগ্রাম বন্দরে। সে সময় বন্দরে জাহাজটি থেকে কনটেইনার খালাস হয় ৩৭০ একক, যার মাধ্যমে ছয় হাজার ৩৩৭ টন পণ্য আনা হয়েছিল। জাহাজটি আবারো এ সপ্তাহেই বাংলাদেশে এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের পণ্যও করাচি বন্দর হয়ে পাকিস্তানের জাহাজের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) বর্তমান সভাপতি তাসকীন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ব্যাপকভাবে জোরদার হচ্ছে। আমাদের প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য অনেকাংশে হ্রাস পাওয়ায় পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে জাহাজ ও সরাসরি উড়োজাহাজ চলাচল শুরু হওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার পর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে সাধারণত টেক্সটাইল ও খাদ্যসামগ্রী আমদানি করে।
এছাড়া পাকিস্তান থেকে কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হবে। তাছাড়া দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করার চেষ্টা হলে আমাদের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রমও বড় হবে।’