মঙ্গলবার , ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮ বুধবার , ১৮ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং, ৫ই পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ খবর
Home / জাতীয় / জীবনযুদ্ধ ! ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে, সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প- খনিয়া খানম ববি।

জীবনযুদ্ধ ! ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে, সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প- খনিয়া খানম ববি।

খনিয়া খানম ববি। মাত্র দুই টাকার ভ্রু-প্লাক করার সুতা দিয়ে শুরু করেছিলেন জীবনযুদ্ধ! এরপর জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে হয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তা। খুলেছেন পার্লার, প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, আয়ুর্বেদিক কসমেটিক কারখানাসহ নানা প্রতিষ্ঠান। করেছেন অনেকের কর্মসংস্থান। শত ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে তাঁর সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প।

‘‘শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঝিনাইদহে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই মায়ের কাছ থেকে শিখি নানা ধরনের হাতের কাজ। এসএসসি দেওয়ার পর সেসব কাজে আরো হাত পাকালাম। ২০০৫ সালে এইচএসসিতে পড়ার অবসরে নেই পার্লারের কাজের প্রশিক্ষণ; কিন্তু পার্লারের কাজ শিখতে গিয়ে এক আপুর কাছ থেকে শুনতে হয় কটু কথা। সেই থেকে মনে প্রচণ্ড জেদ চাপে। মনে মনে বলেছিলাম, আমিই ভবিষ্যতে দেশের সেরা একজন বিউটিশিয়ান হবো, যার নাম সবাই জানবে। তখনই ভাবতাম, আমি কারো অধীনে চাকরি করব না, চাকরি দেব। সে কারণেই খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ শিখি। পার্লারের কাজ শেখার পরই ঘরোয়াভাবে বুটিকের এবং পার্লারের কাজ করতাম। সব ঠিকঠাকই চলছিল।

হঠাৎই পারিবারিক ঝামেলার কারণে রাগ করে ঢাকায় দাদুর বাসায় চলে আসি। বাসায় না বসে থেকে এসেই কয়েক দিন পরে চাকরি নিলাম একটি বিউটি পার্লারে। সেখানে দুই মাস কাজ করে চাকরি বদলালাম। যোগ দিলাম নন্দন মেগা শপে কসমেটিক শাখায়। এর কিছুদিন পর এইচএসসি পরীক্ষার জন্য ঝিনাইদহে চলে যাই। ২০০৬ সালে পরীক্ষা শেষে আবার পড়তে হলো সেই একই ঝামেলায়। পারিবারিক সিদ্ধান্ত  মানতে না পেরে এক কাপড়ে মাত্র ২০০ টাকা নিয়ে আবার ঢাকায় চলে এলাম। কাছের একজনের সহযোগিতায় উঠলাম ফার্মগেটের এক হোস্টেলে। হোস্টেলে জায়গা পেলেও নিজের কিছুই ছিল না। না ছিল টাকা, না ছিল অন্য কোনো সহায়-সম্বল। কী থেকে কী করব ভেবে পাইনি। তখনই মাথায় চিন্তা এলো এখানে থেকেই কিছু করা সম্ভব। কাজ তো জানিই। হোস্টেলের কাজের বুয়ার সহযোগিতা নিয়ে হোস্টেলের মেয়েদের ভ্রু-প্লাকসহ টুকটাক কাজ শুরু করি।

এতেই সেখানে আমার নাম ছড়িয়ে পড়ল। কিছুদিন যেতে না যেতেই লাইন পড়ে গেল। সেখানে ছিলাম মাস তিনেক। এরপর ২০০৭ সালে নিজের আয়ের কিছু টাকা এবং বাবার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডে ‘শী মেকওভার বিউটি পার্লার অ্যান্ড হ্যান্ডিক্রাফট ট্রেনিং সেন্টার’ দিলাম। প্রথম মাসেই আয় হলো ৩২ হাজার টাকা। পার্লারের পাশাপাশি চলত বুটিকের কাজও। সঙ্গে পার্লারের নানা বিষয়ে নতুনদের প্রশিক্ষণও দিই। কিছুদিন পর অনুভব করলাম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটা খুব দরকারি। তা ছাড়া বাবাও চাইতেন আমি অ্যাডভোকেট হই। সেই চিন্তা থেকেই বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিতে ইভিনিং প্রগ্রামে এলএলবিতে ভর্তি হয়ে গেলাম। ব্যবসা ও পড়াশোনা সমানতালে চলল।

কাজের সুবাদেই পরিচয় হতে থাকল অনেকের সঙ্গে। এর ফলে নানা কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। নিজের পার্লারের প্রয়োজনে আয়ুর্বেদিক বিষয়ে ডিপ্লোমা করি। আয়ুর্বেদিক ডিপ্লোমা কোর্স করার পর ঝোঁক তৈরি হয় আয়ুর্বেদিক প্রডাক্ট তৈরির দিকে। এখন সেই পথেই হাঁটছি।’’

এতটা পথ পেরিয়ে আসতে কতটা যুদ্ধ করতে হয়েছে জানতে চাইলে ববি বলেন, ‘আমি শূন্য হাতে ঢাকায় এসেছি। অনেক দিন একবেলা খেয়ে এক কাপড়ে থাকতে হয়েছে। নিজের একটা ভাত খাওয়ার থালাও ছিল না। ভ্রু-প্লাক করার মাত্র দুই টাকার সুতা দিয়ে আমার ব্যাবসায়িক যাত্রা শুরু। সেখান থেকে আজ কোটি টাকার মালিক। শুরুতে কতটা কষ্ট আমাকে সইতে হয়েছে তা বলে বোঝানো যাবে না। আমার পাশে দাঁড়াবার মতো কেউ ছিল না। না ছিল পরিবারের সমর্থন, না ছিল অন্য কেউ। ছিল শুধু নিজের মনোবল আর সাহস। নিজেই বিভিন্ন স্থানে গিয়ে পার্লার ও বুটিকের কাঁচামাল কিনে আনতাম।

 

অনেকের অনেক কথা শুনতে হয়েছে। আমি সেদিকে কান দিইনি। কারণ জানতাম লক্ষ্যে পৌঁছতে গেলে পাছে লোকের কিছু বলায় কান দিতে নেই।

 

নিজের দক্ষতা বাড়াতে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর, এসএমই ফাউন্ডেশন, সমাজসেবা অধিদপ্তরসহ নানা প্রতিষ্ঠান থেকে পঞ্চাশের বেশি বিষয়ের ওপর নিয়েছি স্বল্প ও দীর্ঘকালীন প্রশিক্ষণ।

বিউটি পার্লারের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছি ভারত ও থাইল্যান্ড থেকে। আমি মনে করি, মানুষের শেখার কোনো শেষ নেই। তাই আমি বিষয়ভিত্তিক প্রচুর পড়াশোনা করি এবং সুযোগ পেলেই দেশ-বিদেশের কোনো না কোনো প্রশিক্ষণে অংশ নিই।’

কী কী কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত জানতে চাইলে ববি বলেন, ‘আমার শুরুটা ছিল বুটিক আইটেম দিয়ে। এখন উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে দেশীয় কাপড়ের ওপর ব্লক-বাটিক, শাল, বেডকাভার, যশোরের ঐতিহ্যবাহী নকশী কাঁথা, শাড়ি, থ্রিপিস, ফতুয়া, পাঞ্জাবিসহ নানা ধরনের পণ্য। এসব পণ্য দেশে যেমন বিক্রি হয়, তেমনি পাঠানো হয় দেশের বাইরেও। ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীন, বেলজিয়াম, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আমার পণ্য রপ্তানি হয়। এসব পণ্য তৈরি করা হয় নিজস্ব কারখানার মাধ্যমে। বিউটি পার্লারের জন্য আয়ুর্বেদিক প্রডাক্ট নিজেই তৈরি করি। কাজের সুবাদে যেতে হয় নানা দেশে।

এ ছাড়া পরিশ্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে নানা ধরনের পুরস্কার। যেমন—শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৩ সালে পেয়েছি কুটির শিল্পে ই-ক্যাটাগরিতে ন্যাশনাল প্রডাক্টিভিটি এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড। ২০১৪ সালে পেয়েছি জাতীয় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় যুব পুরস্কার। একই বছর এনটিভি আয়োজিত সেরা বিউটিশিয়ান হিসেবে পেয়েছি ব্যাবিরাস অ্যাওয়ার্ড-২০১৪। সমাজসেবায় অবদানের জন্য পেয়েছি বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড প্রেস সোসাইটি রুরাল জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশন সম্মাননা। যুক্ত আছি উইম্যান চেম্বার অব কমার্স, যশোর চেম্বার অব কমার্স, বিউটি পার্লার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাঙ্গে।’

২০০৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে অধরা ফ্যাশন হাউস, অধরা গ্ল্যামারস ওয়ার্ল্ড লিমিটেড, অধরা জিম ইয়াগো অ্যারোবিক সেন্টার, অধরা স্কিল ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, অধরা গ্ল্যামারস ওয়ার্ল্ড আয়ুর্বেদিক প্রডাক্টস।

 

এসব প্রতিষ্ঠানে শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ বিষয়ে ববি বলেন, ‘সব সময় ভাবতাম, অন্যের অধীনে চাকরি নয়, প্রয়োজনে অনেকের চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করতে চাই।

সে লক্ষ্যে আমার উদ্যোক্তা হওয়া।’ নিজেকে ভবিষ্যতে কোথায় দেখতে চান জানতে চাইলে ববি বলেন, ‘‘নিজের কাজের অগ্রগতির পাশাপাশি সমাজের জন্য কাজ করতে চাই। সে জন্য ঝিনাইদহে ‘স্বাবলম্বী যুব সংস্থা’ এবং ঢাকায় ‘নবসৃষ্টি নারী কল্যাণ সংস্থা’—সমাজসেবামূলক এ দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। দুস্থ ও পিছিয়ে পড়া নারীদের তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী নানা বিষয়ে ট্রেনিংসহ কাজের সংস্থানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সহায়তা করি। পরিকল্পনা রয়েছে একটি বৃদ্ধাশ্রম করার।’’ নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘শিখতে হবে। প্রচুর জানতে হবে। কর্মমুখী শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ খুবই কাজে দেয়। সেই সাথে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগাতে হবে। আমি মনে করি, পরিশ্রম আর সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে পারলে সফলতা আসবেই।’

About todaynews24

Check Also

মনোনয়ন না দেওয়ায় বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে ভাঙচুর

মনোনয়ন না দেওয়ায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করেছেন দলটির তিন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *